অ্যাপেনডিক্সের ব্যথা বুঝবেন কী করে! কখন সতর্ক হতে হবে, জরুরি পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেটে ব্যথার নানান রকম। শারীরিক জটিলতা বা সংক্রমণজনিত রোগ থেকে পেটে ব্যথা হয়েই থাকে। এখন সে ব্যথা কেন হচ্ছে, কীথেকে হচ্ছে সেটা বোঝা যায় না অনেক সময়েই। বিশেষত অ্যাপেনডিক্স বা অ্যাপেনডিসাইটসের ব্যথা হলে রোগী নিজেই তা বুঝে উঠতে পারেন না। বিশেষত মহিলারা অ্যাপেনডিসাইটসের ব্যথা আলাদা করে বুঝে উঠতে পারেন না। জরায়ু বা ডিম্বাধারের ব্যথা, ডিম্বনালীর প্রদাহ, ঋতুস্রাবজনিত জটিলতার কারণেও পেটে ব্যথা হয়, তাই আলাদা করে বোঝার উপায় থাকে না।

অ্যাপেনডিক্স মানেই সেরে যাবে বা তেমন কোনও ব্যাপার নয় গোছের মনোভাব থাকলে কিন্তু বিপদ। ডাক্তারবাবুরা বলেন, বৃহদন্ত্রের শেষভাগে অবস্থিত ছোট্ট নলের মতো অংশটার যেমন কোনও ভূমিকা নেই, তেমনি এই অবাঞ্চিত অঙ্গটাকে হেলাফেলা করলে বা এর সংক্রমণজনিত রোগ চিহ্নিত করে সঠিক সময় অস্ত্রোপচার না করালে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যাপেনডিক্সের ব্যথাকে মামুলি পেট ব্যথার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে বিপদ ডেকে আনেন অনেকেই। রোগ ধরা পড়তে দেরি হলে তার চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হয়। তাই ব্যথা কীথেকে হতে পারে তার প্রাথমিক একটা ধারণা থাকা দরকার। তাহলে আর বিপদের শঙ্কা থাকে না। সঠিক সময় ডাক্তারের পরামর্শও নিতে পারেন রোগী।

Appendicitis: Symptoms, Signs, Causes, Appendectomy in Detail

অ্যাপেনডিক্স কী? অ্যাপেনডিসাইটিস কাকে বলে?

অ্যাপেনডিক্স (Appendix) হল বৃহদন্ত্রের শেষভাগের একটি লম্বা, নলাকার অংশ। কোলন (Colon) থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। দেখতে অনেকটা আঙুলের মতো। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় এই অঙ্গের কোনও কাজ নেই। নিষ্ক্রিয় অঙ্গই বলা চলে। তবে অ্যাপেনডিক্সে যদি সংক্রমণ হয় বা প্রদাহের কারণে ফুলে ওঠে, তাহলে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় তলপেটে। যেহেতু পেটের ডানদিকে থাকে এই অঙ্গ, তাই তলপেটের ডানদিকেই ব্যথা শুরু হয়। অনেক সময় নাভিকে ঘিরেও ব্যথা হতে থাকে। অ্যাপেনডিক্সের এই প্রদাহজনিত রোগকে বলে অ্যাপেনডিসাইটিস (Appendicitis)।

Endometriosis & the Appendix – Bloomin' Uterus

কেন হয় অ্যাপেনডিসাইটিস

আগেই বলা হয়েছে, অ্যাপেনডিসাইটিস হল অ্যাপেনডিক্সের তীব্র প্রদাহ বা সংক্রমণজনিত রোগ। এর নানা কারণে হতে পারে। খাদ্যনালীতে সংক্রমণ হলে বৃহদন্ত্র বা লার্জ ইন্টেস্টাইনে ব্লকেজ হতে পারে। সে কারণে বৃহদন্ত্রের শেষ ভাগে আঙুলের মতো অঙ্গ তথা অ্যাপেনডিক্সের সঙ্গে যুক্ত নালীতে ব্লক হয়ে গিয়ে সংক্রমণ হতে পারে। অনেক সময় মল আটকে গিয়েও ব্লক হয়। রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। অ্যাপেনডিক্সে ক্ষত তৈরি হতে পারে।

Is it appendicitis – or just a sore tummy? | Stuff.co.nz

আবার ভাইরাসের সংক্রমণেও অ্যাপেনডিক্সে তীব্র প্রদাহ হতে পারে। অ্যাপেনডিসাইটিসের লক্ষণ দেখা দিতে থাকে তখন। সঠিক সময় অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেনডিক্স বাদ না দিলে, সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে পেটের ভেতরে। অ্যাপেনডিক্সের ক্ষত বাড়তে থাকলে তা ফেটে গিয়েও বিপত্তি দেখা দিতে পারে।

Appendix Evolved Over 30 Times, May Perform Useful Function, Researchers Say | HuffPost

সাধারণ পেটে ব্যথা না অ্যাপেনডিসাইটিস—কী কী লক্ষণ দেখে বুঝবেন

অ্যাপেনডিসাইটিসের ব্যথা চিহ্নিত করার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে। আসলে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা, খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিং-এর ব্যথার উৎপত্তিস্থল আলাদা। ব্যথার ধরনও ভিন্ন। ডাক্তাররা তা বুঝলেও, সাধারণ মানুষ আলাদা করতে পারেন না। সচেতনতা না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় অনেক দেরি হয়ে যায়। সঠিক সময় অস্ত্রোপচার না করানোর ফলে মৃত্যুও হয়।

যে যে লক্ষণগুলো দেখে সতর্ক হতে হবে—

অ্যাপেনডিক্স হলে তলপেটের ডান দিকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হবে। অনেক সময় নাভির চারদিকেও ব্যথা হতে থাকে। সেটা ক্রমশ তলপেটের ডান দিকে ছড়ায়। তলপেট ফুলে ওঠে।

অ্যাপেনডিক্সে সংক্রমণ হলে শুরুর দিকে কম ব্যথা হয়। ধীরে ধীরে সংক্রমণ বাড়লে ব্যথাও বাড়তে থাকে। সর্বক্ষণ বমি বমি ভাব থাকে। খাবার খেতে সমস্যা হয়।

পেটে ব্যথার সঙ্গে জ্বর হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামা করবে।

জিভে স্বাদ থাকবে না। খাবারে অরুচি হবে। কিছু খেলেই বমি পাবে। হজমে সমস্যা শুরু হবে।

অ্যাপেনডিক্সের সংক্রমণ থেকে পেট খারাপ হতে পারে রোগীর। অনেকের ক্ষেত্রেই ডায়ারিয়া হতে দেখা যায়। আবার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও শুরু হয় অনেকের।

হাঁটাচলা বা কাজকর্ম করার সময় পেটে ব্যথা হবে। সিঁড়ি ভাঙতে গেলে পেটে টান লাগবে। যন্ত্রণা হবে।

এইসব লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

অ্যাপেনডিক্স পরীক্ষা করা হয় কীভাবে

রক্তের নমুনা থেকে অ্যাপেনডিক্সের সংক্রমণ ধরা যায়। পুরুষদের প্রস্রাব ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যাপেনডিসাইটিস ধরা হয়।

মহিলাদের যেহেতু জরায়ুতেও প্রদাহজনিত ব্যথা হতে পারে, তাই অ্যাপেনডিসাইটিস আলাদা করে ধরার জন্য আলট্রাসোনোগ্রাম করা হয়।

পেলভিক সিটি-স্ক্যান বা এক্স-রে করেও অ্যানেসাইটিস ধরা হয়। বাচ্চাদের অ্যাপেনডিসাইটিস পরীক্ষা করার জন্য আলট্রাসাউন্ড করা হয়।

Laparoscopic Appendicitis Removal Surgery Treatment Hospital in Delhi, India- Viezec

সার্জারির সঙ্গে ঘরোয়া টোটকাও জরুরি

অ্যাপেনডিক্স থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় সার্জারি। ডাক্তাররা প্রথমে অ্যান্টিবায়োটিক্স দেন। তবে সময়মতো সার্জারি করা দরকার।

অ্যাপেনডিক্স সার্জারিতে আধুনিক পদ্ধতি হল ল্যাপারোস্কোপি। পেট না কেটেও এই পদ্ধতিতে অ্যাপেনডিক্স বাদ দেওয়া যায়। সিওপিডি বা ক্রনিক রোগে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে বা যাঁদের আগে পেটে কোনও অপারেশন হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপি খুবই উপযোগী পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

অ্যাপেনডিসাইটিসের ব্যথ কমাতে বিশেষজ্ঞরে পরামর্শ নিয়ে কিছু ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, বিশেষজ্ঞরা বলেন গাজর, বিট ও শশার রসের মিশ্রণ দিনে দুবার খেলে ব্যথা অনেকটা কমে।

টাটকা সব্জি বেশি করে খাওয়া ভাল। দিনে পর্যাপ্ত জল খেতে হবে।

লেবুর রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে সকালে খেলে অ্যাপেনডিক্সে সংক্রমণ হয় না।

মেশি ভেজানো ঠান্ডা জলও উপকারি। এতে অ্যাপেনডিক্সের ভেতর পুঁজ বা কোনও সংক্রমণ চট করে হয় না। তবে যে কোনও টোটকাই শরীর বুঝে ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তবেই করা উচিত।