করোনার মধ্যেই ডেঙ্গি ছড়াচ্ছে, উপসর্গ চিনুন, কীভাবে সাবধান থাকবেন

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

করোনার মধ্যেই ডেঙ্গির সংক্রমণ বেড়েছে আমাদের রাজ্যে। খাস কলকাতা শহরেও ডেঙ্গিতে মৃত্যু হয়েছে গত কয়েকমাস আগেই। বর্ষার সময় ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বেড়েছিল। বৃষ্টির জল নামতেই মশার উপদ্রব শুরু হয়েছে।

২০১৯ সালে যেমন হাজার তিনেকের বেশি ডেঙ্গি কেস ধরা পড়েছিল রাজ্যে। গত বছর সেখানে সংখ্যাটা ছিল একশোর কিছু বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডেঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ কমেছিল, সচেতনতার প্রচারও হয়নি সেভাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। দেশের কয়েকটি রাজ্যে ডেঙ্গির প্রভাব মারাত্মকভাবে বেড়েছে।

ডেঙ্গির অ্যান্টিবডি পরীক্ষা জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করা যায় না। চার-পাঁচ দিন পরে ওই পরীক্ষা করাতে হয়। তার আগে রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। কিন্তু রক্তে ডেঙ্গির জীবাণু সক্রিয় থাকে। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এডিস ইজিপ্টাই মশা কামড়ালে রক্তের সঙ্গে ডেঙ্গির জীবাণুও শুষে নেয় মশা। এর পরে সেটি যাকে যাকে কামড়াবে, সকলের শরীরেই ঢুকবে ডেঙ্গির জীবাণু।

কীভাবে ছড়ায় ডেঙ্গি?

ডেঙ্গি হল আরএনএ ভাইরাস। স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশারা হল এই ভাইরাসের বাহক। ডেঙ্গি ভাইরাস মশাদের শরীরে কোনও সংক্রমণ ছড়ায় না।  স্ত্রী মশা পেটে এই ভাইরাস বহন করে।  প্রায় ৮-১০ দিন পরে সেই ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও মশার লালাগ্রন্থির মাধ্যমে লালাতেও চলে আসে। ডেঙ্গি ভাইরাস বহনকারী মশা মানুষের শরীরে কামড়ালে ভাইরাস মানুষের দেহে সংক্রামিত হয়। ভাইরাস প্রথমে লালার মাধ্যমে ত্বকের ভিতরে প্রবেশ করে। পরে শ্বেত রক্তকোষে ঢোকে। এই কোষ শরীরের সবজায়গায় চলাচল করে। তাই কিছুদিনের মধ্যেই ভাইরাস প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় ও সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যাদের ক্রনিক অসুখ, যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, টিবি আছে তাদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গি প্রাণঘাতী হতে পারে।

Dengue Symptoms, Causes & Preventions | Apollo Hospitals Blog

ডেঙ্গি ছোঁয়াচে নয়, তবে ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে ঢুকলে খুব তাড়াতাড়ি বংশবৃদ্ধি করে রোগ ছড়াতে পারে। তখন জটিল অবস্থা তৈরি হবে, বিপদ বাড়বে।

কী কী উপসর্গ দেখে সতর্ক হবেন?

এক, রোগীর জ্বর, দুই, কম প্লেটলেট ও তিন, গায়ে র‍্যাশ। তখন আর দেরি করা চলবে না, পরীক্ষা করে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে কোভিড টেস্টও মাস্ট। ডেঙ্গি হলেই যে করোনা হবে না তেমনটা তো নয়। তাই একদিকে যেমন রক্তের কিছু পরীক্ষা জরুরি, তেমনি সেই রোগীর আরটি-পিসিআর টেস্টও করিয়ে নিতে হবে।

ডেঙ্গির সবথেকে মারাত্মক পর্যায় হল এই ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম। ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম হলে শরীরে জলের পরিমাণ কমে যায়। পালস রেট বাড়ে, রক্তচাপও কমে যায়। সেই সঙ্গে করোনা ধরা পড়লে তার উপসর্গও দেখা দেয়। এইসময় দ্রুত চিকিৎসা দরকার, রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

13 Signs And Symptoms of Dengue Fever in Babies And Toddlers

সতর্ক থাকুন

জল সে নোংরা হোক বা পরিষ্কার কিছুতেই জম থাকতে দেবেন না। জলের বালতি ঢেকে রাখুন। বাড়ির চারপাশে যেন কোনও ভাবেই জল না জমতে পারে সে দিকে কড়া নজর রাখুন।

বাড়ির কাছে প্রচু জমা জল, নিকাশি ব্যবস্থা বেহাল হলে স্থানীয় পুরসভা বা পঞ্চায়েতের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

জমে থাকা ইট, বালি-সিমেন্টের স্তূপে মশা বসবাস করে, তাই এলাকার আশপাশে একেবারেই এ সব জমে থাকতে দেবেন না। একান্তই কোনও বাড়ি তৈরির পরিস্থিতি এলে ওই জায়গার চারপাশে নিয়মিত কীটনাশক ও মশা মারার স্প্রে দিন।

ব্লিচিং, কীটনাশক বা তেলে ছড়ান বাড়ির চারপাশে, তবে তার চেয়েও বেশি জোর দিন আগাছা পরিষ্কারে।

যত অনভ্যাসই থাক, মশারির ভিতর ঘুমোন। বাড়িতে শিশু থাকলে ও বাড়ির চারপাশ অপরিষ্কার হলে অবশ্যই সারা দিন মশারি টাঙিয়ে রাখুন।

রাসায়নিক দেওয়া মশা নিরোধক ক্রিম মাখানোর চেয়ে ঘরোয়া কিছু উপায়ে মশা দমন করুন।

একান্তই অসুবিধা থাকলে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ওষুধ বা তেল কিনুন। মাঝে মাঝেই বদলে দিন ওষুধ। দীর্ঘদিন একই জিনিস ব্যবহার করলে মশা তার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’