২১ নম্বর ক্রোমোজোমেই গন্ডগোল, ডাউন সিনড্রোমেও কিন্তু জিনিয়াস হতে পারে বাচ্চা

গুড হেলথ ডেস্ক

ছোটবেলায় পরিবার ভেবেছিল বাচ্চা অ্যাবনর্মাল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মেধা তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সকলকে। হাবভাব, আচরণ, কথাবার্তায় আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার (Down syndrome) মতো না হলেও, তাঁর হাতে বশ মেনেছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত বাদ্যযন্ত্র। বেহালা, স্যাক্সোফোন, ট্রাম্পেট, ড্রাম, পিয়ানো ঝঙ্কার তোলে তাঁর হাতে। অ্যাওয়ার্ডে ভরে গিয়েছে ঘর। অপরা উইনফ্রে শো থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, তাঁকে নিয়েই চর্চা। তিনি সুজিত দেশাই। ভারতে প্রথম ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত সঙ্গীত শিল্পী যাঁর খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome) এমন এক জেনেটিক রোগ যা ভ্রূণ অবস্থাতেই বাসা বাঁধে। জন্মানোর পরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম হয় শিশু। বুদ্ধির বিকাশ থমকে যায়। শরীরিক গঠনেও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। হরমোনের সমস্যা হয় বাচ্চার। দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দুইই ক্ষীণ হয়। এমনও দেখা গেছে, শৈশবে এমন সব লক্ষণ দেখে পাগল ভেবে বসেন বাবা-মা। বাচ্চার যত্নআত্তিও সেভাবে হয় না। কিন্তু ডাক্তরাবাবুরা বলছেন, ডাউন সিনড্রোম মানে বাচ্চা পাগল নয়। একধরনের জিনগত রোগ যে কারণে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না অনেক সময়ে। তবে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চাকে জিনিয়াস হতেও দেখা গেছে। যেমন সুজিত দেশাই, মডেল মেডেলিন স্টুয়ার্ট, অলিম্পিক জিমন্যান্ট ও মডেল চেলসিয়া ওয়ার্নার ইত্যাদি।

Down Syndrome

কেন হয় ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome)?

জিনগত ত্রুটিতে এই রোগ হয়। ভ্রূণ তৈরির সময় ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে ২১ তমটিতে দুটির বদলে তিনটি ক্রোমোজম থাকে। তাই একে  ‘ট্রাইজোমি-২১’ বলা হয়। ১৮৬৬ সালে ইংরেজ চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন অসুখটিকে প্রথম চিহ্নিত করেন বলে তাঁর নামেই অসুখটির নাম রাখা হয় ডাউন সিনড্রোম।

 Down Syndrome কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

শরীরের গঠন খর্ব হয়, গলা ও ঘাড় ছোট হয়।

মুখ ফোলা থাকে, দাঁতের গঠন এলোমেলো হয়, ত্বক হয় খসখসে

শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক না-ও হতে পারে। 

পায়ের বুড়ো আঙুল ও তার পাশের আঙুলের মধ্যে অনেকটা ফাঁক থাকে। 

হার্ট, অন্ত্র, থাইরয়েডের সমস্যা থাকতে পারে ছোট থেকেই।

হরমোনের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ অনেকটাই কম হয়।

ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome) রয়েছে, এমন শিশু ও কিশোরদের অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও ফিজিওথেরাপি করানোর দরকার হয়।

 Down syndrome

 

বাচ্চার ডাউন সিনড্রোম থাকলে বাবা-মায়েরা কী কী বিষয়ে নজর দেবেন

গর্ভবতী হওয়ার  ১০ সপ্তাহ পরে ‘কোরিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং’ (chorionic villus sampling) কিংবা ১৫ সপ্তাহ পর ‘অ্যামনিওসেন্টেসিস’ (Amniocentesis) পরীক্ষায় ধরা পড়ে ভ্রূণ ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত কিনা।

গর্ভাবস্থার ১০ থেকে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে আলট্রাসোনোগ্রাফিতেও ধরা পড়তে পারে এই রোগ।

‘সেল-ফ্রি ফিটাল ডিএনএ’ রক্তপরীক্ষা করলেও ধরা পড়ে ডাউন সিনড্রোম।

জন্মের ৬ ও ১২ মাসের মাথায় এবং পরে বছরে একবার করে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষা করানো দরকার।

জন্মের ৬ মাসের মাথায় থাইরয়েড টেস্ট করানোও দরকার। 

২ বছর বয়স থেকে প্রতি ৬ মাসে একবার দাঁত পরীক্ষা করা জরুরি।

হার্ট, অন্ত্র, কিডনির টেস্ট করানোও জরুরি। ডাউন সিনড্রোম থাকলে চট করে নানা সংক্রমণজনিত রোগ হতে পারে। নানারকম কোমর্বিডিটি থাকতে পারে বাচ্চার।

শিশুর অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে কিনা সেটা জেনেও থেরাপি শুরু করা দরকার। ঘাড়ের এক্স-রে করতেই হবে।

ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চার স্পিচ থেরাপি, ফিজিও থেরাপি, স্পেশাল এডুকেশন, স্পেশাল ডায়েটের ব্যবস্থা করতে হবে। মাঝেমধ্যেই মনোবিদের থেকে কাউন্সেলিং করিয়ে নেওয়া ভাল। এই ধরনের বাচ্চাদের অবহেলা করলে তাদের মানসিক অবস্থা আরও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তাই আর পাঁচজন সাধারণের মতোই দেখতে হবে তাদের। যত্নও করতে হবে সেইভাবে। কে বলতে পারে এই বাচ্চাদের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতে একজন জিনিয়াসের জন্ম হবে না!