ঘন ঘন খিঁচুনি, সারা শরীরে র‍্যাশ, কোন রোগের চিকিৎসায় রোগীকে কোমায় পাঠাল আরজি কর

গুড হেলথ ডেস্ক

খিঁচুনি থামার নাম নেই। টানা ১৪ দিন ধরে ঘন ঘন খিঁচুনি হয়েই চলেছিল রোগীর। সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রদাহ। রোগটা কী, তা ধরতেই পারেননি ডাক্তাররা। কলকাতার আরজি কর মেডিক্যালের ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন, রোগী লুপাস (Lupus Disease) রোগে আক্রান্ত। সারা শরীরে র‍্যাশ, একটানা খিঁচুনি, পেশির প্রদাহে জর্জরিত রোগী। মৃতপ্রায় অবস্থা। দেরি না করেই রোগীকে কৃত্রিম কোমায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারবাবুরা।

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের প্রধান ডা. সুগত দাশগুপ্ত বলেছেন, ওই মহিলার লুপাস (Lupus disease) উইথ সিএনএস ভাসকুলাইটিস হয়েছিল। বারবার খিঁচুনির জন্য তিনি প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়ায় চলে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে রোগীকে কোমায় পাঠিয়ে চিকিৎসা এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সাধারণত রোগী কোমায় চলে যাওয়া মানেই চিন্তা বাড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে উল্টোটাই হয়। রোগীর এত বেশি খিঁচুনি হচ্ছিল যে সেই অবস্থায় চিকিৎসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তাই কৃত্রিমভাবে কোমায় পাঠিয়ে তাঁর রোগ সারানোর ব্যবস্থা করেন আরজি করেন ডাক্তারবাবুরা।

 lupus

লুপাস রোগ (Lupus disease) কী?

ক্রনিক অটো-ইমিউন রোগ। একবার হলে মৃত্যু পর্যন্ত ওষুধ খেয়েই যেতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, লুপাস সেরে যায়—এই ধারণা কোনও রোগীকে না দেওয়াই ভাল। তবে ওষুধ ঠিকমতো খেলে রোগী ভাল থাকতে পারেন, তেমন দৃষ্টান্তও রয়েছে।

ডাক্তারি ভাষায় এই রোগকে বলে ‘সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস’ (SLE)। সিস্টেমিক অর্থাৎ শরীরের একটি অঙ্গে নয়, একাধিক অঙ্গে এই রোগের প্রভাব দেখা যেতে পারে। লুপাস কথাটির মানে প্রদাহ। আর এরিথেমাটোসাস কথাটির মানে লাল হয়ে ফুলে যাওয়া।

অঙ্গের কোষের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটলে তা রোগ প্রতিরোধী ইমিউন কোষগুলিকে নষ্ট করতে শুরু করে। ফলে নিজের শরীরের কোষই শত্রু হয়ে যায়। লুপাস একদিনে হয় না, ধীরে ধীরে এই রোগের উপসর্গগুলো বোঝা যায়। যেহেতু শরীরের একাধিক অঙ্গে লুপাস হতে পারে, তাই এই রোগটি গোড়ায় চিহ্নিত করা যায় না অনেক সময়ে।

কী কী উপসর্গ দেখা দেয়?

লুপাসের একটি অতি সাধারণ উপসর্গ হল মুখে লাল রঙের র‍্যাশ বেরোনো। কপাল, নাকের চারপাশ এবং গালে লালচে রঙের র‍্যাশ বেরোয়। চামড়াও খানিক ফুলে থাকে। একে বলা হয় বাটারফ্লাই র‌্যাশ। রোদের সংস্পর্শে এলে এই অংশটি আরও লাল হয়ে যায়। জ্বলুনি এবং চুলকানি বাড়ে।

একাধিক অস্থি সন্ধিতে ব্যথা বা ফোলাভাব থাকে। দিন দিন যন্ত্রণা বাড়তে থাকে।

খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, যা এক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, জ্বর নামতেই চায় না।

বুকে ব্যথা, এমনকী হার্টও আক্রান্ত হতে পারে।

রক্তশূন্যতা, রক্তে শ্বেতকণিকা বা অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, রক্তাল্পতা এই রোগের লক্ষণ।

হার্ট, ফুসফুস, কিডনি এবং সর্বোপরি মস্তিষ্কেও লুপাসের প্রভাব পড়তে পারে। হার্ট আক্রান্ত হলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ে। ফুসফুসে হলে নিউমোনিয়া হতে পারে। বাকি উপসর্গগুলির সঙ্গে খিঁচুনির উপসর্গ থাকলে বুঝতে হবে, মস্তিষ্ক এসএলইতে আক্রান্ত হয়েছে।

মৃগী কেন হয়? আতঙ্ক নয়, বিশ্ব এপিলেপ্সি দিবসে রোগ জয়ের বার্তা দিচ্ছেন ডাক্তারবাবুরা

চিকিৎসকের মতে, এই রোগের তীব্রতা কখনও কখনও এমন বেড়ে যায় যে, রোগী বিছানা ছাড়তে পারেন না। মারাত্মক খিঁচুনি শুরু হয়। আবার তীব্রতা কমলে, তিনি কয়েক মাস হয়তো ভালভাবে কাটালেন। রোগের প্রভাব মাঝেমধ্যে সাঙ্ঘাতিক পর্যায়ে চলে যায়। লুপাস ছোঁয়াচে নয়, বংশগত রোগও নয়। এ রোগের কোনও নিরাময় নেই, তবে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা করলে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসা না করলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইউরিন টেস্ট এবং কিডনির বায়োপসি করে রোগ নির্ণয় করা যায়। এই টেস্টের রিপোর্ট দেখে এসএলই কোন স্টেজে রয়েছে বা কেমন ওষুধ দেওয়া হবে, তা বুঝতে পারেন চিকিৎসকেরা।