মাঙ্কিপক্স: রোগটা কী? কীভাবে ছড়াচ্ছে? কোন লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন

গুড হেলথ ডেস্ক

মাঙ্কিপক্সের (Monkeypox) সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। ভারতেও ঢুকে পড়েছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। করোনার পরে মাঙ্কিপক্স নিয়ে উদ্বেগ চরমে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের। সংক্রমণ যাতে বিদেশ থেকে এ দেশে ঢুকতে না পারে তাই ইতিমধ্যেই বিমানবন্দরগুলিতে সতর্কতা জারি করেছে কেন্দ্র। এখন প্রশ্ন হল কী এই মাঙ্কিপক্স? কীভাবে ছড়ায়? কাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি?

মাঙ্কিপক্স ভাইরাস কী?

স্মলপক্স বা গুটিবসন্তের জাতভাই। কিন্তু আরও বেশি সংক্রামক মাঙ্কিপক্স ভাইরাস (Monkeypox)। মাঙ্কিপক্স ভাইরাস Orthopoxvirus genus পরিবারের। গুটিবসন্ত যে গোত্রের ভাইরাস থেকে হয় মাঙ্কিপক্সও সেই গোত্রেরই। এই ভাইরাসের সংক্রমণেও জ্বর, সারা গায়ে বড় বড় ফোস্কার মতো র‍্যাশ বের হবে (Monkeypox)। ত্বক শুকিয়ে খসখসে হয়ে যাবে, প্রচণ্ড চুলকানি, জ্বালা হবে র‍্যাশের জায়গায়।

Monkeypox virus

কীভাবে ছড়ায় ভাইরাস?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মৃত প্রাণীর মাংস, মলমূত্র থেকে ছড়ায় ভাইরাস (Monkeypox)। আফ্রিকার রডেন্ট বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণীই এই ভাইরাসের বাহক। ১৯৫৮ সালে আফ্রিকার এক প্রজাতির বাঁদরের মধ্য়ে এই ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিল, তখনও মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেনি। ১৯৭০ সালে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও নাইজেরিয়াতে এই ভাইরাস প্রথম খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের শরীরে। সেই সময় রডেন্ট জাতীয় প্রাণীর মাংস থেকেই ছড়িয়েছিল সংক্রমণ। এখন বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমিত ৬ হাজারেরও বেশি।

কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি দেখা গেছে। যদিও উগান্ডায় এই ভাইরাসের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা চলছিল বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কোনও ভ্যাকসিন এখনও তৈরি হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

Monkeypox

মার্কিন সিডিসি-র অনুমান, বীর্যের মাধ্যমেও ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। বাইসেক্সুয়াল, সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়েছে। যৌনমিলনে ভাইরাস ছড়াতে পারে কিনা সে নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে ভাইরাস তার চরিত্র বদলায়। মিউটেশন বা জেনেটিক বদল ঘটিয়ে আরও সংক্রামক হয়ে ওঠে। মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ আগে স্মলপক্সের মতোই ছিল। কিন্তু এখন এই ভাইরাসের চরিত্র বদলে যেতে পারে। হিউম্যান ট্রান্সমিশন বা মানুষের শরীরে সংক্রমণ বাড়ছে। কোভিডের পরে মাঙ্কিপক্স নতুন মহামারী হয়ে আনবে কিনা সে নিয়ে উদ্বেগে হু।

কী কী উপসর্গ দেখা দিচ্ছে?

মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ হলে  লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাবে। সারা গায়ে চাকা চাকা র‍্যাশ বের হবে। সেই সঙ্গেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসবে। এই ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ২-৩ দিন। সংক্রমণ ছড়ানোর তিন দিনের মাথায় ধূম জ্বর আসবে রোগীর।

Monkeypox

যে যে লক্ষণ দেখা দেবে– ধুম জ্বর

সারা গায়ে ব্যথা

ফুলে উঠবে লসিকা গ্রন্থি

সারা গায়ে লাল বড় বড় র‍্যাশ

সংক্রমণ বেশি ছড়ালে ফোস্কার মতো র‍্যাশ বের হবে

ত্বক শুকিয়ে খসখসে হয়ে যাবে, প্রচণ্ড চুলকানি, জ্বালা হবে

মানুষের শরীরে বা কোনও সারফেসে এই ভাইরাস ২১ দিন অবধি বেঁচে থাকতে পারে।

বাচ্চাদের ভয় কতটা?

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) জানাচ্ছে, স্মলপক্স ভ্যাকসিন যারা নেয়নি তাদের ভয় বেশি। তাই শিশুদের আগে এই ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্য়বস্থা করতে হবে। , বাচ্চাদের এই ভাইরাল সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। পাঁচ বছরের নীচের বাচ্চারাও রয়েছে হাইরিস্ক গ্রুপে। তাই এখন থেকেই সাবধান হতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এক জন অন্য জনের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে, বিশেষ করে ত্বকের সংস্পর্শে এলে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বড়দের থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে বাচ্চাদের মধ্য়েও।

মাঙ্কিপক্সের (Monkeypox) জন্য নতুন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আসছে

একেই করোনা নিয়ে নাকাল, তার মধ্য়ে মাঙ্কিপক্স ছড়ালে কী বিপদ হবে সে নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য় সংস্থাও (হু) মাঙ্কিপক্স ভাইরাসকে কাবু করার উপায় ভাবছে। নানারকম ভ্যাকসিন ও ওষুধপত্র নিয়ে গবেষণা চলছে। এর মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ জানিয়েছে, অ্য়ান্টিভাইরাল দুই ওষুধেই সারতে পারে মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের সংক্রমণ।

দ্য ল্যানসেট ইনফেকশিয়াস ডিজিজ জার্নাল (The Lancet Infectious Diseases journal) -এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল অবধি ব্রিটেনে মাঙ্কিপক্স সারাতে দু’রকম অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নিয়ে গবেষণা চলছিল। সাতজন ভাইরাস আক্রান্তের ওপর ওই দুই ওষুধের থেরাপি করে সুফল পাওয়া যায়। ল্যানসেটের প্রতিবেদন বলছে, ব্রিনসিডোফোবির ও টেকোভিরিম্যাট নামে দু’ধরনের ওষুধ নির্দিষ্ট ডোজে খাওয়ানো হয়েছিল সাতজন রোগীকে। তাঁদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও তিনজন মহিলা। আক্রান্তদের মধ্য়ে স্বাস্থ্যকর্মীরাও ছিলেন। ক্যাপসুলের মতো ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল, কোনও ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়নি।

কী এই দুই ওষুধ? ব্রিনসিডোফোবির হল টেমবেক্সা ব্র্যান্ড নামে বিক্রি হয়। অ্য়ান্টিভাইরাল ওষুধ যা স্মলপক্স সারাতে কাজে লাগে। মাঙ্কিপক্সের (Monkeypox) সংক্রমণ যেহেতু স্মলপক্সের মতোই, তাই এই ওষুধেই কাজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাইটোমেগালোভাইরাস, অ্য়াডেনোভাইরাস, হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস, বিকে ভাইরাসের সংক্রমণ সারাতে এই ওষুধ কাজে লাগে।

টেকোভিরিম্যাট ওষুধ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। আমেরিকায় তৈরি হয় এই ওষুধ। অর্থোপক্সভাইরাস যেমন স্মলপক্স ও মাঙ্কিপক্স (Monkeypox) সারাতে কাজে আসতে পারে বলেই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। TPOXX এই ব্র্যান্ড নামে বিক্রি হয় টেকোভিরিম্যাট। বিজ্ঞানীদের দাবি, কোষে ভাইরাসের ট্রান্সমিশন বা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারে এই ওষুধ।

মাঙ্কিপক্সের কি কোনও ভ্যাকসিন আছে?

মাঙ্কিপক্স প্রতিরোধ করতে নতুন ভ্যাকসিন আসছে বাজারে। ড্য়ানিশ বায়োটেক ফার্ম এই ভ্যাকসিন বানিয়েছে। সংক্রমণ দ্রুত ঠেকাতে ভ্যাকসিনে ভরসা রাখছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। জানা গেছে, ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিনের (Monkeypox Vaccine) এক লাখ ডোজ কেনা হয়েছে।

ড্যানিশ বায়োটেক ফার্ম থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টিকার ডোজ কিনেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এই টিকার ডোজ বিশ্বের সংক্রমিত দেশগুলিতে সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউরোপিয়ান হেলথের কমিশনার স্টেলা কিরিয়াকিডস। তবে কী ধরনের ভ্যাকসিন (Monkeypox Vaccine) বানিয়েছে ড্যানিশ বায়োটেক ফার্ম তা এখনও স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।

নাম বিতর্ক

ভাইরাসের নাম ‘মাঙ্কি’ কেন রাখা হয়েছে সে নিয়ে বিস্তর সমালোচনা চলছে। এমনিতেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ আফ্রিকার দেশগুলিতেই বেশি। কাজেই এখানে নামকরণের সঙ্গে বর্ণবৈষম্যের দিকটা জড়িয়ে আছে কিনা সে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। ভাইরাসের নামকরণ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ভাবনাচিন্তা করতে বলা হয়েছে।

Monkeypox Virus

মাঙ্কিপক্স (Monkeypox) প্রথম ছড়ায় আফ্রিকা থেকে। তাই এই ভাইরাসজনিত রোগের নাম কীভাবে যেন মাঙ্কিপক্স হয়ে যায়। আফ্রিকার অধিবাসীদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করেই এই ভাইরাসের এমন নাম দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলেন বিজ্ঞানীরা। ৩০ জন বিজ্ঞানীর একটি দল চিঠি লিখে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আঙুল তোলার পরেই শোরগোল পড়ে যায়। হু, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের টনক নড়ে। বিজ্ঞানীমহলেও আলোচনার আসর বসে। কেন নাম মাঙ্কিপক্স হল সে নিয়ে আওয়াজ তোলেন বিজ্ঞানীমহলের একাংশ। নাইজেরিয়ার আফ্রিকান সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ফর জিনোমিক্স অব ইনফেকশিয়াস ডিজিজের ডিরেক্টর ক্রিস্টিয়ান হ্যাপ্পি বলেছেন, “বর্ণবৈষম্যের চূড়ান্ত নিদর্শন। আফ্রিকান মানুষজনকেই নিশানা করে এমন নাম দেওয়া হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট দেশকেই টার্গেট করা হয়েছে। রোগের নামকরণেও এমন শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্য খুবই দুঃখজনক।”

১৯৫৮ সালে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রথম মাঙ্কিপক্স ভাইরাস ছড়ায়। মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায় ১৯৭০ সালে। মূলত কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও মধ্য আফ্রিকাতেই প্রথম সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। তাই এই ভাইরাসের প্রজাতিদের নামও আফ্রিকার সেইসব অঞ্চলের নামেই রাখা হয়েছিল। আফ্রিকান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল জানাচ্ছে,  আমেরিকাতেও সংক্রমণের খোঁজ মিলেছিল অনেক আগেই। ধীরে ধীরে ইজরায়েল, সিঙ্গাপুর, ব্রিটেন, পর্তুগাল, স্পেন, নরওয়েতে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এতগুলো দেশে যখন সংক্রমণ ছড়িয়েছে তাহলে এখনও কেন ভাইরাসের নাম এমন থাকবে। দ্রুত নাম বদলানোর আর্জি জানিয়ে হু-কে চিঠি দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। হু প্রধান টেড্রস অ্য়াডহানাম ঘেব্রেইসাস বলছেন, কোনওরকম বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। মাঙ্কিপক্স ভাইরাস ও তার উপপ্রজাতিদের নাম বদলানো হবে খুব দ্রুত। নামকরণে বদলের জন্য পদক্ষেপ করবে হু।