করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পূর্বাভাস ছিলই, মানুষই সতর্ক ছিল না

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

গত বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের কথা মনে পড়ছে। একদিনে যখন করোনা আক্রান্ত রোগী ৯৭ হাজারে গিয়ে ঠেকেছিল, তখনই সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল বিজ্ঞানীদের মনে । আইআইটি খড়্গপুর ও আইআইটি কানপুরের বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, করোনার শেষ হতে সময় লাগবে। মহামারী আরও বিশাল আকারে আছড়ে পড়তে পারে দেশে। এই সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছিল দেশবাসী তা জানা নেই। কারণ নতুন বছর পড়তেই যেভাবে বাঁধভাঙা উল্লাসের মতো মেলামেশা শুরু হয়ে গিয়েছিল তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখেছিলেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সম্ভাবনা ছিলই । তা সত্যিই হল । বছর ঘোরার চার মাসও গেল না, অতিমহামারী কয়েক গুণ শক্তি বাড়িয়ে ফিরে এল । তছনছ করে দিল সবকিছু ।

দেশে আজই দৈনিক সংক্রমণ ২ লাখ ছাড়িয়েছে। সংক্রমণে মৃত্যুও হাজারের বেশি। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, কেরল, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তীসগড়ের অবস্থা ভয়াবহ। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, করোনার চতুর্থ ঢেউ আছড়ে পড়েছে রাজধানীতে। এই ঝাপটা আগের থেকেও ভয়ঙ্কর। শয়ে শয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু করোনা বিধি মেনে চলা হচ্ছে না। জমায়েত, মেলামেশায় লাগাম নেই। করোনা বিধি না মানলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন কেজরিওয়াল। তা সে যাই হোক, সংক্রমণ কেত এত বিশাল আকার নিল সেটাই বলি।

Second wave of COVID-19 in UK has reached “critical” stage, says study

শুরুতে ভুল অনুমান করা হয়েছিল

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) ও ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই)-এর বিজ্ঞানীরা একটি সুপার মডেলের কথা বলেছিলেন। শুরুতে তাঁরা অনুমান করেছিলেন, করোনা শীতের সময় ফের একটা বড় ধাক্কা দেবে, কিন্তু বছর ঘুরলে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। এমনও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল যে ফেব্রুয়ারির পর থেকে দেশে সংক্রমণের হার কমতে শুরু করবে। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমবে, মৃত্যুহার একের নীচে নেমে যাবে।

How to stop Covid's second wave - Cover Story News - Issue Date: Apr 19, 2021

এই অনুমান খুব একটা মিথ্যা হয়নি। কারণ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণের হার একদমই কমে গিয়েছিল। হাসপাতালে আক্রান্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা প্রায় শূন্যে গিয়ে ঠেকেছিল। তাই মানুষজনও ভেবেছিলেন করোনা বুঝি চলে গেছে। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর তাই মাস্ক পরা বা সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মেনে চলার নিয়ম মানেননি অনেকেই। তার ওপর ভোটের প্রচার, উৎসব-অনুষ্ঠানে জমায়েত তো ছিলই। করোনা নিয়ে যে ভয়টা ছিল, তা একপ্রকাশ বিদায় নিয়েছিল মানুষের মন থেকে। বেপরোয়া মনোভাব বেড়ে গিয়েছিল অনেক। এই গা ছাড়া মনোভাবই লাগামছাড়া সংক্রমণের অন্যতম বড় কারণ।

India Covid-19 second wave has crossed previous spike, worrying: Govt | Hindustan Times

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসন্ন দেখেও সম্বিত ফেরেনি

গত বছর দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী এলাকায় যে সেরো সার্ভে হয়েছিল, তাতে দেখা গিয়েছিল রাজধানীর প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। যার অর্থ হল, বেশিরভাগ মানুষই অজান্তে সংক্রামিত হয়েছেন এবং সেরেও উঠেছেন। আরও একটা ব্যাপার দেখা গিয়েছিল তা হল, উপসর্গহীন রোগী বা অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দিল্লিতে। এটাই ছিল সঙ্কেত সতর্ক হওয়ার। এই উপসর্গহীন বা রোগের লক্ষণহীন রোগীরা চুপিসাড়ে সংক্রমণ ছড়িয়েছে বহুজনের মধ্যে। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে এত মারাত্মক সংক্রমণের এটা আরও একটা কারণ। কনট্যাক্ট ট্রেসিং ঠিকমতো হয়নি, তাই আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা রোগীদের চেনা যায়নি। তাঁরাই আবার অনেকের মধ্যে সংক্রমণের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

Looking at the Data: Is There a Second Wave of COVID in India?

দেশে টিকাকরণ শুরু হওয়ার পরেও অনেকে নিশ্চিন্তে ছিলেন যে ভাইরাস বুঝি আর ছড়াবে না। তাই কোভিড বিধি মেনে চলা হয়নি অনেক জায়গাতেই। আসলে যতদিন না টিকার প্রভাব শরীরে কাজ করা শুরু করে ততদিন অবধি সুরক্ষা বলয় তৈরি হবে না। দেশের একটা বড় অংশের মানুষের শরীরে ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি  তৈরি হলে তবেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। তার আগে অবধি সতর্ক থাকতেই হবে।

India Covid-19 cases pass 10 million

সময় এখনও আছে, উপসর্গ দেখলেই সতর্ক হোন

করোনা সংক্রমণে নাকের গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে যাচ্ছে। মুখের স্বাদ হারাচ্ছেন অনেক করোনা রোগীই। গবেষকরা বলছেন, এগুলো হল প্রাথমিক রিস্ক ফ্যাক্টর। ভাইরাল লোড যদি বেশি হয় অর্থাৎ সংক্রমণ যদি শরীরে বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তার প্রভাব যেমন পড়ছে হৃদপিণ্ডে, তেমনি মস্তিষ্ক বা ব্রেনে। স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হতেও দেখা গেছে অনেক রোগীকে। ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নাল একটা রিপোর্টের কথা বলেছিল,  ৫৫ শতাংশ করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংক্রামিত হওয়ার তিনমাসের মধ্যে নিউরোজিক্যাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয়েছে রোগী। অনেকের আবার হ্যালুসিনেশন হয়েছে, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ভাইরাসের সংক্রমণে এই উপসর্গগুলো দেখা দিচ্ছে যা চিন্তার কারণ। তবে আতঙ্ক না করে সতর্ক হওয়া উচিত। করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এলেই ‘ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং’ বা এমআরআই স্ক্যান করিয়ে নেওয়া উচিত। রোগ শুরুতে ধরা পড়লে চিকিৎসায় সারানো সম্ভব।

তাছাড়া, কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রথম উপসর্গ হচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। সেখান থেকে জ্বর। আর জ্বরের সঙ্গেই সর্দি বা শুকনো কাশি। ক্রমাগত কাশি চলতেই থাকবে। এর সঙ্গেই সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হবে। বিশেষত পেশির ব্যথায় কাবু হবে রোগী। বমিভাব, ঝিমুনি একই সঙ্গে দেখা দেবে। কিছুদিন পর থেকেই হজমের সমস্যা শুরু হবে। পেট খারাপও হতে পারে রোগীর।  গবেষকরা বলছেন, এই উপসর্গগুলো যদি টানা চলতে থাকে তাহলেই কোভিড টেস্ট করাতে হবে। এইগুলো প্রাথমিক উপসর্গ। টেস্ট করিয়ে করোনা পজিটিভ ধরা পড়লে চিকিৎসায় দ্রুত সেরে ওঠা সম্ভব। কিন্তু রোগ পুষে রাখলে পরে সেটা মারাত্মক আকার নেবে। এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে তীব্র শ্বাসকষ্ট। সেই সঙ্গে বুকে ব্যথা। ঠোঁট ও জিভে নীলচে ছোপ পড়তে পারে। অনেকেরই মুখের স্বাদ ও নাকের গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায়। সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।