শরীরে অক্সিজেন ঢুকিয়ে দুরারোগ্য রোগ সারছে, ‘হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বার’-এর ইতিহাস বহু পুরনো

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোট একটা চেম্বার। কয়েকজন মানুষ দিব্যি এঁটে যেতে পারে। চেম্বারের ভেতরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে রাখা আছে। অক্সিজেনের লেভেল খুবই বেশি। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন যাঁরা বা দুরারোগ্য ব্যধি ধরা পড়েছে তাদের এই চেম্বারে ঢুকিয়ে চিকিৎসা করার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছিল কয়েক দশক আগেই। ১৬৬২ সালে এমন অক্সিজেন চেম্বার তৈরি করে জটিল শ্বাসযন্ত্রের রোগের চিকিৎসা করা হত। ১৯৪০ সালে এই চেম্বারই আরও একটু আধুনিক হয়। যুদ্ধে আহত সেনা জওয়ান বা সমুদ্রের গভীরে নামতে হয় যে সেনা ডাইভারদের, তাঁদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হত এই চেম্বার। এমনতর অক্সিজেন চেম্বারই এখন অন্য রূপে ফিরে এসেছে। শ্বাসযন্ত্রের রোগ শুধু নয়, অনেক জটিল অসুখের চিকিৎসার জন্যই ব্যবহার করা হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই বিশেষ ধরনের থেরাপিকে বলে ‘হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি’ (Hyperbaric Oxygen Therapy) বা এইচবিওটি (HBOT)।

Hyperbaric medicine - Wikipediaএখন প্রশ্ন হল এই হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি কী?

তার আগে হাইবারবারিক অক্সিজেন চেম্বারের ব্যাপারটা একটু বুঝে নিতে হবে। কাঁচ দিয়ে ঢাকা চেম্বার, একজন মানুষ এঁটে যেতে পারেন। পুরোটাই এয়ারটাইট। চেম্বারের ভেতরে বাতাসের চাপ বাইরের পরিবেশের থেকে অন্তত তিন গুণ বেশি। বিশুদ্ধ অক্সিজেনযুক্ত বাতাস। কাজেই এই চেম্বারের ভেতরে কোনও মানুষকে রাখলে তাঁর ফুসফুসে অনেক বেশি অক্সিজেন ঢুকবে। এই বিশুদ্ধ বাতাস শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে গিয়ে শরীরের কোষগুলিতে আরও বেশি পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে যেন শরীরে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইডের পরিমাণ কমবে, তেমনি শরীরে যে কোষগুলিতে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে বা ক্ষত তৈরি হয়েছে সেগুলিও অক্সিজেনের চাপে সংক্রমণমুক্ত হতে শুরু করবে।

Hyperbaric Oxygen Therapy (HBOT) | What Is It | Healogics
হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি চেম্বার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি চেম্বারে নির্দিষ্ট সময় থাকলে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে যায়। ব্যাকটেরিয়া বা কোনও সংক্রামক প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেম অ্যাকটিভ হয় অর্থাৎ শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলি সেরে উঠতে শুরু করে কোনওরকম ওষুধ বা রেডিয়েশন ছাড়াই।

রক্তাল্পতা, জ্বালাপোড়া ক্ষত, ক্যানসার রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সারায় হাইবারবারিক অক্সিজেন থেরাপি

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি চেম্বার নানা রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগে। প্রথমত, রক্তে এয়ার বাবল বেড়ে গেলে তা কমাতে সাহায্য করে এই চেম্বার। স্কুবা ডাইভ করে যাঁদের সমুদ্রের গভীরে নামতে হয়, তাঁদের ডিকমপ্রেশন ইলনেস (ডিসিআই) দেখা দেয়। সারা শরীরে এয়ার বাবলের পরিমাণ সাঙ্ঘাতিকভাবে বেড়ে যায়। অতিরিক্ত এয়ার বাবল কমাতে ডিকম্প্রেশন চেম্বারে কিছু সময় কাটাতে হয় রোগীদের। সে কাজ আরও আধুনিক উপায় করতে পারে হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি চেম্বার।

50% Off 60-Minute Hyperbaric Oxygen Chamber Session | Pekoda

ডাক্তাবাবুরা বলছেন, অক্সিজেন থেরাপি চেম্বারের প্রয়োগ হয় আরও নানাভাবে। সিভিয়ার অ্যানিমিয়া, জ্বালাপোড়া ক্ষত, মস্তিষ্কের কোনও আঘাত, গ্যাংগ্রিন সারাতে এই চেম্বারে রেখে থেরাপি করেন ডাক্তাররা। এমনকি ক্যানসার কোষের অনিয়মিত বৃদ্ধি কমাতে যে রেডিয়েশন থেরাপি করা হয়, তার কারণে অনেক সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মারাত্মক। ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে অক্সিজেন থেরাপি করেন ডাক্তারবাবুরা।

Oxygen Therapy - Hyperbaric Oxygen Therapy Chamber

Health Essentials Hyperbaric Oxygen Therapy | Buffalo & WNY

ক্ষীণ দৃষ্টি, এইচআইভি, হেপাটাইটিসের থেরাপিও হয় অক্সিজেন চেম্বারে!

ডাক্তারবাবুরা বলছেন, হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বারের আসল কাজ হল সারা শরীরে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। এই চেম্বারে এত বেশি অক্সিজেনযুক্ত বাতাসের চাপ থাকে, যে শরীরের সমস্ত কোষই তাতে উপকৃত হয়। এমনও দেখা গেছে, ক্ষীণ দৃষ্টি, বধিরতার চিকিৎসাতেও এই অক্সিজেন চেম্বারের থেরাপিতে উপকার পেয়েছেন রোগীরা। এইচআইভি, হেপাটাইটিস, হার্টের অসুখ, স্ট্রোক, মাইগ্রেন সারাতেও অক্সিজেন থেরাপির প্রয়োগ হচ্ছে বিশ্বজুড়েই।

অক্সিজেন চেম্বার আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে তা হল, মানসিক অবসাদের থেরাপি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপ্রেশন, স্ট্রেস থেকে নানাটা রোগ ধরে যায়। এই স্ট্রেস কমাতে অক্সিজেন থেরাপি বিশেষভাবে কাজে আসে। অ্যালঝাইমার্স, পারকিনসনস ডিজিজের চিকিৎসাতেও এখন অক্সিজেন থেরাপি চেম্বারের ব্যবহার করছেন চিকিৎসকরা।

হাইপারবারিক অক্সিজেন ইউনিট–অনেক রোগীর থেরাপি একসঙ্গে হয়

অক্সিজেন চেম্বার সাধারণত একজন মানুষের জন্যই ডিজাইন করা। তবে বর্তমানে বহু মানুষের থেরাপি একসঙ্গে করার জন্য হাইপারবারিক অক্সিজেন ইউনিট তৈরি করা হচ্ছে। এই ইউনিট একটা ঘরের মতো। এই ঘরের বাতাসের চাপ একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখা হয়। রোগীদের মুখে বিশেষ ধরনের মাস্ক ও মাথায় হুড পরিয়ে দেওয়া হয়। এই মাস্ক ও হুডের মাধ্যমে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ঢোকে শরীরে। রোগীরা এই ইউনিটে বসে গান শুনতে পারেন, টিভি দেখতে পারেন। আধ ঘণ্টা বা ২ ঘণ্টা করে এক এক সেশন হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ বুঝে সেশন বাড়ানো হয়। অনেক ক্রনিক অসুখের চিকিৎসাও এই পদ্ধতিতে সহজে হয়।