হাঁপানির উৎস খুঁজে বের করবে, পূর্ব ভারতে প্রথম স্পুটাম টেকনিক নিয়ে এল কলকাতার হাসপাতাল

গুড হেলথ ডেস্ক

পূর্ব ভারতে প্রথম হাঁপানি ও অ্যালার্জি টেস্টের জন্য আধুনিক ও উন্নতমানের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হচ্ছে কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালে। এই পরীক্ষা পদ্ধতির নাম স্পুটাম সেল কাউন্ট টেকনিক (Sputum Cell Count)। এই পরীক্ষা করার জন্য অত্যাধুনিক স্পুটাম ল্যাবরেটরিও খোলা হচ্ছে। এতদিন হাঁপানি বা অ্যালার্জি টেস্টের জন্য যে পরীক্ষা পদ্ধতিগুলো চালু ছিল, স্পুটাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে উন্নতমানের। রোগের একেবারে গোড়ার কারণ বা উৎস খুঁজে বের করাই এই টেস্টের কাজ। 

হাঁপানি বা অ্যাজমা অতি বিষম বস্তু। আক্রান্তেরা এর যন্ত্রণা বিলক্ষণ জানেন, আর যাঁরা অল্প ঠান্ডাতেই হাঁচি-কাশি-শ্বাসকষ্টে অস্থির তাঁরা মুঠো মুঠো ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি পেয়ে ভাবেন, এই তো অর্ধেক রোগ সেরেই গেল, তাঁরা ভুল ভাবছেন। হাঁপানি কমানো সহজ ব্যাপার নয়। কী থেকে হচ্ছে অ্যালার্জি (Sputum Cell Count), কেন হচ্ছে সংক্রমণ, শ্বাসনালীর কোন জায়গায় কোন কোষের কম বা বেশির জন্য সমস্যা ক্রনিক হয়ে যাচ্ছে সেটা চিহ্নিত করার জন্যই এই স্পুটাম সেল কাউন্ট টেকনিক। এই পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন, অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের অধ্যাপক ও অ্যালার্জি অ্যান্ড ইমিউনোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. শৈবাল মৈত্র এবং অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ডিরেক্টর মেডিক্যাল সার্ভিস (ইস্টার্ন রিজিয়ন) ডা. সুরিন্দর সিং ভাটিয়া।

doctors  

স্পুটাম সেল টেকনিক কী? কীভাবে কাজ করে?

ডা. শৈবাল মৈত্র বলছেন, স্পুটাম টেকনিক এমন একটা পদ্ধতি যেখানে রোগের আসল কারণ খুঁজে বের করা যায়। যে রোগীর টেস্ট করতে হবে তাঁর কফ বা থুতুর নমুনা নিয়ে তার মধ্যের রোগের উৎস যে কোষটি সেটা খুঁজে বের করা হয়। ডাক্তারবাবু বললেন, ধরা যাক, কারও শরীরে ইওসিনোফিল বেশি, কারও বেসোফিল আবার কারও লিম্ফোসাইট। এই কোষগুলির তারতম্য হলেই তখন হাঁপানি, অ্যালার্জি, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। এই কোষগুলোর তারতম্য হলে তখন প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হয়। তার থেকেই শ্বাসযন্ত্রের যত সমস্যার সূত্রপাত হয়। এখন এই ইনফ্ল্যামেটরি কোষগুলোকে চিহ্নিত করাই স্পুটাম সেল কাউন্টের কাজ। ধরা যাক, কারও শরীরে ইওসিনোফিল বেশি তাকে সেই মতোই থেরাপিতে রাখা হবে ও ওষুধ দেওয়া হবে। আবার অন্য রোগীর ক্ষেত্রে যে কোষের আধিক্য আছে তার ওষুধ অন্য রকম হবে। সব রোগীকে একই গতে বাঁধা থেরাপিতে রাখলে রোগ তো সারবেই না, বরং ভুল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য অসুখ বাসা বাঁধবে।

স্পুটাম সেল কাউন্ট (Sputum Cell Count) এমন পদ্ধতি যেখানে রোগীর নমুনায় থাকা সেই ইনফ্ল্যামেটরি কোষগুলোকে বের করে সেই মতো ওষুধের থেরাপি শুরু করতে পারবেন ডাক্তারবাবুরা। নিখুঁতবাবে রোগের শণাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি। এতদিন বাইরের দেশগুলোতে ছিল, এবার কলকাতাতেও শুরু হবে বলে জানালেন ডাক্তারবাবুরা। এতে খরচ কম এবং একদিনের মধ্যেই টেস্ট করে রিপোর্ট পাওয়া যাবে।

হাঁপানি হানা দেয় কেন?

হাঁপানি বা অ্যাজমা (Ashthma) হয় মূলত শ্বাসনালীতে প্রদাহের কারণে। দীর্ঘকালীন প্রদাহের ফলে শ্বাসনালীর স্বাভাবিক ব্যস কমে যায় এবং সংবেদনশীলতা বাড়ে। ফলে ফুসফুসের ভিতর বায়ু ঢোকা ও বেরনোর পথ সংকীর্ণ হয়ে যায়। শ্বাসনালীর ভেতর মিউকাসের ক্ষরণ বাড়তে বাড়তে সেটা আরও সঙ্কুচিত হতে থাকে। সঠিক চিকিৎসা না হলে শ্বাসনালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। চিকিৎসকরা অনেক ক্ষেত্রেই বলেন অ্যাজমা বংশগত কারণে হতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে যেভাবে ধুলো-দূষণ বাড়ছে তাতে হাঁপানির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। আরও কিছু কারণে হাঁপানির টান বাড়তে পারে।

অ্যাকিউট অ্যাজমা খুবই সাঙ্ঘাতিক। এর ট্রিটমেন্ট সঠিক সময়ে না হলে রোগীর ভোগান্তি হয় অনেক বেশি। হাঁপানির লক্ষণ এক একজনের ক্ষেত্রে এক একরকমের। সাধারণত অল্পেই হাঁপ ধরা, বুকে ব্যথা, শ্বাস নিতে গেলে সমস্যা, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাশি হওয়া, অনবরত হাঁচি, শ্বাস নিতে ও ছাড়তে গেলে বুকের ভেতর সাঁই সাঁই শব্দ, চোখ দিয়ে ক্রমাগত জল পড়া, চোখে জ্বালা—এইসবই হাঁপানির উপসর্গ। হাঁপানির সমস্যায় কখনও আগে টান ওঠে, পরে অন্যান্য লক্ষণ দেখা দেয়। আবার ঠিক এর উল্টোটাও হতে পারে। তাই রোগ কী থেকে হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা খুব জরুরি। স্পুটাম সেই কাজটাই করবে। 

কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এর আগেও হাঁপানি চিকিৎসার জন্য উন্নত পদ্ধতি ব্রঙ্কিয়াল থার্মোপ্লাস্টি (Bronchial Thermoplasty) নিয়ে এসেছে। ব্রঙ্কিয়াল থার্মোপ্লাস্টি (বিটি) একটি ব্রঙ্কোস্কোপিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে সিভিয়ার অ্যাস্থমা নিরাময় করা যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংকীর্ণ বায়ুপথ প্রসারিত হয়ে শ্বাসের গতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে একটি ক্যাথেটার ব্যবহার করা হয়। সেটি উইন্ডপাইপের মাধ্যমে ঢুকিয়ে তাপ দেওয়া হয়। এই তাপ ফুসফুসের পেশিগুলিকে টার্গেট করে যাতে সেই পেশীগুলি সঙ্কুচিত হয় এবং শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে। হাঁপানি বাড়াবাড়ি পর্যায় যেতে না পারে।

ব্রঙ্কিয়াল থার্মোপ্লাস্টির (Bronchial Thermoplasty) জন্য তিনটি সিটিং প্রয়োজন হয়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে তিনবার সিটিং করতে হয়। এই থেরাপিতে কাটা-ছেঁড়া করার দরকার পড়ে না। যন্ত্রণাহীন পদ্ধতিতেই হাঁপানি নিরাময় করেন ডাক্তাররা।