রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে চুল? শ্যাম্পু, হেয়ার কালারের কী কী রাসায়নিক ক্ষতি করছে চুলের

গুড হেলথ ডেস্ক

চুল ভাল রাখতে কী ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করা ভাল, সে প্রশ্ন সকলেরই। বাজার চলতি সব শ্যাম্পুই যে আপনার চুলের পক্ষে ভাল হবে (Dry Hair) তেমনটা নয় কিন্তু। তারপর এখন নানা রকম হেয়ার কালার ব্যবহার করেন অনেকে। তার থেকেও চুলের ক্ষতি হয়। সকলের চুল তো আর এক রকম হয় না, তাই শ্যাম্পু এবং হেয়ার কালার কেনার সময় ব্র্যান্ডের চাকচিক্যে ভোলার বদলে বরং উপাদানগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিলে বেশি ভাল হয়। কারণ শ্যাম্পুতে এমন কিছু উপাদান থাকে যা সবার চুলের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। অনেকেই বলেন একরাশ কেমিক্যাল দেওয়া শ্যাম্পুর বদলে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি শ্যাম্পু অনেক বেশি ভাল। তা কথাটা ভুল নয়, তবে যাই শ্যাম্পু কিনুন না কেন তার উপাদানগুলো অবশ্যই দেখে কেনা উচিত।

এখন প্রশ্ন আসবে কেন এত বিধিনিষেধ। তার কারণ একটাই, শ্যাম্পুতে এমন কিছু রাসায়নিক মেশানো থাকে যা চুলের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট করে দেয়। ডার্মাটোলজিস্টরা তো প্রায়ই বলেন, শ্যাম্পুতে বেশি সালফেট থাকলে চুলের ক্ষতি হয়। চুল পাতলা হতে থাকে। আবার শ্যাম্পু বেশিদিন তাজা রাখার জন্য এমন কিছু প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়, যা মাথার ত্বকেরও ক্ষতি করে। প্রতিবার শ্যাম্পু করার পরে চুল আরও রুক্ষ (Dry Hair)  হতে থাকে। তাই কী ধরনের শ্যাম্পু আপনার চুলের জন্য পুষ্টিকর তা বাছাই করে নেওয়াই ভাল। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নিতে পারেন।

dry and damaged hair

এখন দেখে নেওয়া যাক কী কী ক্ষতিকর উপাদান থাকে শ্যাম্পুতে—

অ্যামোনিয়াম লরেল সালফেট/ সোডিয়াম লরেথ সালফেট

সালফেট হল শ্যাম্পুর সবচেয়ে খারাপ উপাদান। শ্যাম্পুতে সাধারণত সালফেট থাকে। এবার কী ধরনের সালফেট রয়েছে সেটা দেখে কিনতে হবে। যদি দেখা যায় উপাদানে অ্যামোনিয়াম লরেল সালফেট বা সোডিয়াম লরেথ সালফেট রয়েছে, তা হলে সেই শ্যাম্পু না কেনাই ভাল। কারণ সালফেট চুলের প্রাকৃতিক তৈলাক্তভাবটা নষ্ট করে দিতে থাকে। যে কারণে দেখা যায় শ্যাম্পু করার পরে চুল রুক্ষ, প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে। চুলের প্রোটিন নষ্ট করে দেয় সালফেট, ফলে চুলের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। চুল পাতলা হতে থাকে।

সোডিয়াম লরেথ সালফেট এমন এক টক্সিক উপাদান যা মাথার ত্বকেরও ক্ষতি করতে পারে। ফলে তাড়াতাড়ি চুল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ডাক্তাররা তাই বলেন, সালফেটের বদলে অ্যামাইনো অ্যাসিড ও বায়োটিন থাকা শ্যাম্পু ব্যবহার করতে। এই দুই উপাদান চুলের প্রোটিন নষ্ট হতে দেয় না, চুলও সতেজ থাকে।

 Rough Hair

প্যারাবেন

কসমেটিক প্রডাক্টে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রুখতে প্যারাবেন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই প্যারাবেন এন্ডোক্রিন হরমোনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। পারফিউম ও কোলনে সাধারণত ব্যবহার করা হলেও শাওয়ার জেল, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ও কিছু লোশনেও প্যারাবেন থাকে। এই রাসায়নিক স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এই ক্ষতিকর রাসায়নিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। ত্বকের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় শুষ্ক ভাব, অ্যালার্জি যেমন হতে পারে, তেমনই এই রাসায়নিক ত্বকের গভীরে গিয়ে রক্তে প্রবেশ করলে তার থেকে হতে পারে বড়সড় শারীরিক সমস্যাও।

সোডিয়াম ক্লোরাইড

সোডিয়াম ক্লোরাইড মানে হল সাধারণ সল্ট বা নুন। শ্যাম্পুর ঘনভাব বজায় রাখতে সোডিয়াম ক্লোরাইড মেশানো হয়। যদি এই সল্ট মেশানো শ্যাম্পু ঘন ঘন ব্যবহার করা হয়, তাহলে চুলের গোড়া নষ্ট হতে থাকে (Dry Hair) । মাথার স্ক্যাল্প শুষ্ক হয়ে যায়, সেখানে চুলকানি, র‍্যাশ হতে পারে। অকালে চুল পড়ে যেতে পারে।

পলিইথিলিন গ্লাইকল

শ্যাম্পু ঘন করার জন্য এই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর অনেক রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। শুষ্ক স্ক্যাল্প, চুল পড়ে যাওয়া, চুলের প্রোটিন নষ্ট করা ইত্যাদি। তাছাড়া চুলে যদি কন্ডিশনার বা অন্য জেল ব্যবহার করা হয় তাহলে সেইসবের উপাদানের সঙ্গে মিশে মাথার ত্বকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

15 Harmful Ingredients

ডাইইথানোলামাইন ও ট্রাইইথানোলামাইন

এই দুই রাসায়নিক নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ডাইইথানোলামাইন উপাদানটি বেশি শরীরে ঢুকলে ক্যানসারের মতো মারণ রোগ ছড়াতে পারে। যদিও, ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বলেছে, এই গবেষণার কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। তবে এই দুই রাসায়নিক উপাদান শ্যাম্পুতে থাকলে তা কেনাই ভাল।

ফর্মালডিহাইড

ফর্মালডিহাইড বা মিথানল হল রাসায়নিক যৌগ। জলে দ্রবীভূত হলে ফর্মালিন তৈরি করে। এর বৈশিষ্ট্যই হল ক্ষতিকর ব্যকটেরিয়া বা প্যাথোজেন মেরে ফেলা। তাই শ্যাম্পুতে অনেক সময় এই রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। কিন্তু এই উপাদান যদি বেশি পরিমাণে ত্বকে মিশতে থাকে তাহলে তা ক্যানসারের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফর্মালডিহাইড হল কার্সিনোজেনিক উপাদান, তাই এর ব্যবহার যত কম হয় ততই ভাল।

অ্যালকোহল

শ্যাম্পুতে অ্যালকোহল থাকে তা যেমন মাথার ত্বক শুষ্ক (Dry Hair) করে দিতে পারে। চুলও রুক্ষ হয়। অ্যালকোহল জীবাণুনাশ করে, তবে বেশি ব্যবহারে চুলের ক্ষতি হতে পারে। শ্যাম্পু কেনার সময় অবশ্যই দেখে নিতে হবে কী ধরনের অ্যালকোহলিক উপাদান আছে। যদি সিটেল অ্যালকোহল বা স্টেরাইল অ্যালকোহল থাকে তাহলে সমস্যা নেই। এই দুই অ্যালকোহলিক উপাদান চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখে। তবে যদি রুক্ষ চুলের সমস্যা থাকে তাহলে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল বা প্রোপানল জাতীয় উপাদান ব্যবহার না করাই ভাল। কারণ আইসোপ্রোপাইল চুল সতেজ করার বদলে আরও রুক্ষ করে দেবে।


সুগন্ধি ও কৃত্রিম রঙ

শ্যাম্পুতে নানা রকম সুগন্ধি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর সবকটাই কিন্তু ভাল নয়। বেশি সুগন্ধিযুক্ত শ্যাম্পু মানেই তাতে একগাদা রাসায়নিক থাকে। আর এইসব রাসায়নিক ত্বকে ঢুকে নানা শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। ক্যানসার, হাঁপানির মতো রোগ হতে পারে। মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এইসব রাসায়নিক। তাছাড়া ত্বকের র‍্যাশ, নানারকম সংক্রমণজনিত রোগের কারণও হতে পারে। তাই শ্যাম্পু কেনার সময় সুগন্ধে না ভুলে তার উপাদান দেখে কেনাই উচিত।

কৃত্রিম রঙ একই রকম ক্ষতি করে। নানা রকম রঙ দেখতে ভাল লাগে ঠিকই, তবে তা মাথার ত্বকের জন্য মোটেও ভাল নয়। মার্কিন এফডিএ অনেক আগেই এইসব কৃত্রিম রঙ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছে। পেট্রোলিয়ামজাত উপাদান থেকে তৈরি হয় এইসব রঙ যা ক্যানসারের বড় কারণ।

ডাইমেথিকোন

একধরনের সিলিকন। মূলত প্লাস্টিকজাত উপাদান। এই রাসায়নিকের কারণে চুল উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু গবেষণা বলছে, প্রথণ প্রথম এই উপাদানের ব্যবহারে চুল খুব সতেজ ও উজ্জ্বল দেখাবে। কিন্তু বেশি ব্যবহার করলেই চুলের স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকবে। একটা সময় পরে দেখা যাবে চুল প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। অনেক রুক্ষ ও পাতলা হয়ে গেছে। চুল পড়াও বেড়ে যাবে অনেক। তাই শ্যাম্পুতে এই উপাদানটি থাকলে একেবারেই কেনা উচিত নয়।

কোকামিডোপ্রোপাইল বেটাইন

কখনওই ভাববেন না নারকেলের উপাদান থেকে তৈরি। পুরোদস্তুর রাসায়নিক উপায় এটি তৈরি করা হয়। এই উপাদান ত্বকের ক্ষতি করে। শ্যাম্পুতে থাকলে মাথার ত্বক তো বটেই শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও চলে আসতে পারে এই রাসায়নিক, যার ফলে ত্বকে চুলকানি, র‍্যাশ, একজিমা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ট্রাইক্লোসান ও রেটিনাইল পামিটেট

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট হিসেবে ট্রাইক্লোসানের ব্যবহার হয়। এই রাসায়নিক ক্ষতিকর দিকের কথা ভেবেই ২০১৬ সাল থেকে এটির প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও সাবান, টুথপেস্ট বা শ্যাম্পুতে এই রাসায়নিকের দেদাড় প্রয়োগ হচ্ছে। যার ফলে স্নায়ুর রোগ দেখা দিচ্ছে। হরমোনের সমস্যাও হচ্ছে অনেকের।

রেটিনাইল পামিটেট ত্বকে ঢুকলে রেটিনলে বদলে যায়। রেটিনল নানা রকম ত্বকের রোগের জন্য দায়ী। বিভিন্ন অ্যান্টি-এজিং ক্রিমেও রেটিনল থাকে। ডাক্তাররা বলেন, এই রাসায়নিকের ব্যবহার বেশি করলে ত্বকের ক্যানসার হতে পারে। প্রজনন ক্ষমতা কমতে পারে। বিভিন্ন অঙ্গের জটিল রোগও হতে পারে।

তাই এখন থেকে শ্যাম্পু কেনার সময় একটু বেশিই সাবধান থাকতে হবে। চুলের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে কোনটা প্রয়োজন সেটা বাছাই করে তবেই কিনুন।