চটজলদি ওজন কমাতে গিয়ে ভুল করছেন না তো? বিপদ আসতে পারে নিঃশব্দে

গুড হেলথ ডেস্ক

পেট-কোমরে মেদ যেমন জমে ধীরে ধীরে, তেমনি তা ‘বার্ন’ করার প্রক্রিয়াও চটজলদি হতে পারে না। নিয়মমাফিক রোজকার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ওজন কমাতে হয় (Health Care)। শরীরকে সেই মতো সইয়ে নিতে হয়। একেবারে দুম করে কয়েক কেজি ওজন কমিয়ে ফেললে শরীরেও তার অনুরূপ বন্দোবস্ত করতে পারে না। ফলে আচমকাই প্রেসার ফল, হার্ট রেট বেড়ে যাওয়া বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও প্রবল হয়।

এখনকার বিজ্ঞাপনী চমকে ভুলে কমদিনে রোগা হতে গিয়ে অনেকেই অতিরিক্ত এক্সারসাইজ করে ফেলছেন যা শরীর সইতে পারছে না। একদিকে যেমন বাড়তি ঘাম ঝরাচ্ছেন, তেমনি অন্যদিকে কম খেয়ে বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলছেন (Health Care)। শরীর সঠিক পুষ্টি পাচ্ছে না, ফলে ভিটামিন ও মিনারেলসের অনুপাতের তারতম্য হচ্ছে। ফলে নানা অসুখ বাসা বাঁধছে চুপিসারে।

exercise

চটজলতি ওজন কমাতে গিয়ে বা তাড়াতাড়ি মেদ ঝরিয়ে আকর্ষণীয় চেহারা পেতে অনেক ভুলব্রান্তি করে ফেলছেন কমবয়সিরা। সম্প্রতি বাঁশদ্রোনীর বছর কুড়ির এক তরুণীর জিম করতে করতেই মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, দ্রুত ওজন কমানোর তাড়া ছিল মেয়েটির। নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত এক্সারসাইজ করতে গিয়েই বিপদ বাঁধিয়ে ফেলেছেন। খবর শোনা গেছে, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান রাজু শ্রীবাস্তব জিমে করতে করতেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন। এমন ঘটনা এখন আকছার ঘটছে। স্লিম-ট্রিম হতে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ফেলছেন জেন এক্স-জেন ওয়াইরা।

শরীরচর্চার নিয়ম আছে, মেদ ঝরুক ধীরে ধীরেই

অনেকেই চটজলদি ওজন কমাতে গিয়ে স্বল্প সময়ে শর্ট কাট পদ্ধতির সাহায্য নেন। এর ফলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ওজন কমানোর একমাত্র বিজ্ঞানসম্মতভাব পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন ১ ঘণ্টা করে শরীরচর্চা ও হাঁটাহাঁটি করা দরকার (Health Care)। গা ঘামিয়ে ব্যায়াম বা মর্নিং ওয়াকের বদলে অনেকে স্লিমিং সেন্টারে গিয়ে চটজলদি ওজন ঝরানোর চেষ্টা করেন। এর ফলে সাময়িক কিছুটা ওজন কমলেও নিয়ম না মানলেই আবার বেড়ে যাবে।

 Exercises

প্রথমেই রক্তচাপ, হার্টের অবস্থা ও রক্তে শর্করার মাত্রা জেনে নিয়ে তবেই ওজন কমানোর জন্যে শরীরচর্চা ও হাঁটাহাঁটি শুরু করতে হবে।

অনেক সময় ওজন কমাতে গিয়ে হাঁটা চলা শুরু করলে বুক ধড়ফড় করে ও শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ট্রেড মিল টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত।

খাওয়াদাওয়ার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে ভাবেন, নিয়মিত শরীরচর্চা করলে যা ইচ্ছে খাবার খাওয়া যায়। কিন্তু জাঙ্ক ফুড বা প্রসেস করা খাবার বা বেশি পরিমাণে ভাজাভুজি খেলে শরীরের যে পরিমাণে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়, তা শুধু ব্যায়াম করে সারানো সম্ভব নয়।

অনেকেরই অজান্তে ধমনীতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমতে থাকে। ধমনীর মধ্যে দিয়ে রক্ত সঞ্চালনের সময় ওই জমে থাকা পদার্থের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেখান থেকে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক। বিশেষত, অতিরিক্ত পরিশ্রম করার সময় এমন সমস্যা হওয়ার ভয় বেশি থাকে। উত্তেজিত হলে বা বেশি পরিশ্রম করলে স্বাভাবিকের তুলনায় হার্টের স্পন্দন বাড়ে। ফলে হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। জিমে ঘাম ঝরানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

৪০ বছর বয়সের পরে জিমে যাওয়া শুরু করলে আগে লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করান। মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খেতে হবে ও একটা ইসিজি করিয়ে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে হার্টের সমস্যা থাকলেও তা ধরা পড়ে যাবে। জিম প্রশিক্ষককে চিকিৎসকের করা প্রেসক্রিপশন দেখাতে হবে বা ডাক্তারবাবুর দেওয়া পরামর্শের কথা বলতে হবে। তাহলে সংশ্লিষ্ট ফিটনেস বিশেষজ্ঞ রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝে ব্যায়াম করতে দেবেন।

দীর্ঘক্ষণ কার্ডিও করা হার্টের পক্ষে ভাল নয়। যাঁরা সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা করে দৌড়ন, তাঁদের শারীরিক ফিটনেস ভাল হলেও হার্টের চার পাশের পেশিগুলি সঙ্কুচিত হতে থাকে। তাতে ঝুঁকি বাড়ে।

ব্লাড প্রেশার খুব বেশি হলে হাল্কা থেকে মাঝারি কার্ডিও বা অ্যারোবিক এক্সারসাইজ এবং সঙ্গে ওয়েট ট্রেনিং করা সবচেয়ে ভাল।

জিম করার পাশাপাশি অনেকেই রোগা হওয়ার ওষুধ খান। এই ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে হজম ক্ষমতা কমে যায়, অবসাদ বেড়ে যায়।

health care

ক্র্যাশ ডায়েট নয় ব্যালান্সড ডায়েট মানতে হবে

ডায়েট মানে হল ব্যালান্সড চার্ট (Diet)। মানে যার শরীরে যতটা সয়, তাকে ঠিক ততটাই খাবার দেওয়া। আর খাবার দিলেই হল না, তাতে পুষ্টি উপাদান কতটা আছে সেটাও যাচাই করা দরকার। ডায়েট সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়। শরীরচর্চা শুরু করলে সেই মতো ডায়েটও মেনে চলতে হবে। অনেকেই ভাবেন এক্সারসাইজ করতে যা খুশি খাওয়া যায় সেটাও যেমন ভুল, তেমনি অনেকে আবার কম খেতে শুরু করেন। সেটাও ভুল।

জিম করতে করতে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, অতিরিক্ত ঘাম ঝরাতে গিয়েই কি বিপদে ঘটছে?

বয়স, পেশা, রোজকার অভ্যাস, মেডিক্যাল হিস্ট্রি, পরিবারে রোগের ইতিহাস, ইত্যাদি দেখেশুনে যাচাই করে ক্য়ালোরির হিসেব কষে ডায়েট চার্ট বানিয়ে দেন পুষ্টিবিদেরা। এইচার্ট বানানো কিন্তু সহজ কাজ নয়, সবটাই জটিল অঙ্ক। যিনি অ্য়ানিমিয়ায় ভুগছেন তাঁর ডায়েট চার্ট একরকম হবে আবার যাঁর হাই কোলেস্টেরল-ওবেসিটি তাঁর ডায়েট অন্যরকম হবে। কারও চার্টে শুধু প্রোটিন বেশি থাকবে, কেউ আবার কার্বোহাইড্রেট ছুঁতেই পারবেন না। কিন্তু এরপরেও শরীরে ভিটামিন, মিনারেলস, ফাইবার সবকিছুর পরিমাণ সমান সমান থাকবে, এনার্জি ফ্লো-ও ঠিক রাখতে হবে।

Diet or exercise

ব্যালান্সড ডায়েট রোজকার যাপনে মেনে চলাই যায়। এতে আলাদা করে বিশাল খরচের ব্যাপার নেই, ঘরে যা রোজকার খাওয়াদাওয়া তারই একটু এদিক ওদিক করে ডায়েট (Diet) মানা যায়। কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল সব থাকবে ব্যালান্সড ডায়েটে। শাকসবজি, বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি, স্যালাড যেন রোজের খাদ্যতালিকায় থাকে। ডাল, রুটি ফাইবারের জোগান অটুট রাখবে। গোটা ফলেও প্রচুর ফাইবার থাকে। আবার ঘি, সর্ষের তেল, তিলের তেল, আখরোট, কাজু, আমন্ড ফ্যাটের চাহিদা পূরণ করবে, তবে বাইরে থেকে কেনা খাবার, ট্রান্স ফ্যাট আছে এমন খাবার খাওয়া চলবে না। রোজের খাবার থেকেই কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট ছেঁকে নিতে হবে। প্রোটিনের জন্য ডাল, পনির, ছানা, ডিম, চিকেন, ছোলা-মুগ, ছাতু, মাছ সবই খেতে পারেন। প্রতিদিন খাবার পাতে ৪০ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট রাখতে হবে। রাতের দিকে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণটা কমিয়ে দিন। সুষম ডায়েট বা ব্যালান্সড ডায়েটে শরীর-রসনাকে বঞ্চিত করে কিছু করা হয় না। সবই খান কিন্তু মেপে আর সময় বুঝে। তাতেই ওজন কমবে সমানুপাতিকভাবে।