ভাল-মন্দে ইলিশ, স্বাদে-পুষ্টিতে রাজকীয়, কিন্তু হিসেব না মেনে খেলেই মুশকিল

গুড হেলথ ডেস্ক

ইলিশ ভালবাসেন না এমন বাঙালি মনে হয় কমই আছে (Hilsa Fish)। ঘটি-বাঙালের সর্বকালীন তর্ক-বিতর্কে যাচ্ছি না। ইলিশ এমনিও ভাতের পাত আলো করে থাকে। সর্ষে ইলিশ, ভাপা, ইলিশ পাতুরি, দই ইলিশ, ইলিশের টক, ভাজা, ইলিশের ডিম আর কত কী যে ইলিশের পদ হতে পারে তার তালিকা শেষ হবে না। তবে বাঙালির ইলিশ প্রেম যতটা খাঁটি, ইলিশের বাঙালি প্রেমও কিন্তু ঠিক ততটাই। ইলিশকে বাঙালি ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে। 

বৃষ্টি কম হোক ক্ষতি নেই, শ্রাবণের মেঘলা আকাশ দেখে চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর কাটুক তাতে দোষ নেই, কিন্তু বর্ষা এলে পাতে ইলিশ উঠবে না এমনটা হতেই পারে না। জলের এই উজ্জ্বল শস্য়টি (Hilsa Fish) দামে যতই ভারী হোক না কেন, পকেট-বন্ধু না হলেও রসনার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব কোনওদিনই ভাঙবে না। রামলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কষ্টিপাথর’ নাটকে বড় মজার এক বর্ণনা ছিল মাছের রাজাকে নিয়ে, ‘কি যে গড়ন যেন ননীর চাপ থেকে কেটে তুলেছে৷ দিব্বি দোহারা, একটু পাশ থেকে গোলাপীর আভা মাচ্চে৷’

Season's fresh Hilsa fish

ইলিশ মাছের নাম শুনলেই কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড, গ্যাস-অম্বল-অ্যালার্জির বাঙালি যতই হাহুতাশ করুক না কেন, ইলিশ মাছের পুষ্টিগুণ কিন্তু দারুণ। পুষ্টিবিদেরাই বলছেন, নোলা সামলে হিসেব কষে যদি ইলিশ খাওয়া যায় তাহলে হার্ট থেকে কিডনি সব ভাল থাকবে। ইলিশ এমন এক সামুদ্রিক মাছ  প্রচুর পরিমাণ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকে। ফলে হার্ট থাকে সুস্থ। আরও নানা গুণ আছে ইলিশের। তবে দোষও আছে। সে কথায় পরে আসা যাবে।

How to make Ilish Bhapa Shorshe Recipe

রাজকীয় ইলিশ পুষ্টিগুণেও একশোয় একশ

ইলিশ মাছ (Hilsa Fish) খেলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভাল হয়। থ্রম্বসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের সঙ্গে অস্টিওআর্থারাইটিসের প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। প্রতি দিনের ডায়েটে সামুদ্রিক মাছ থাকলে বাতের ব্যথা, গেঁটে বাতের যন্ত্রণা থেকে রেহাই মেলে।

Hilsa

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড অবসাদের মোকাবিলা করতে পারে। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার (SAD), এমনকি পোস্ট ন্যাটাল ডিপ্রেশন কাটাতেও ইলিশের জুড়ি মেলা ভার।

সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করে ওমেগা ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। ত্বক ভাল রাখে ইলিশ। চুলকানি-ঘা, একজিমার মতো ত্বকের অসুখের ঝুঁকি কমে।

ইলিশ (Hilsa Fish) খেলে নাকি স্মৃতিনাশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ব্রেনকে চাঙ্গা রাখে। বাচ্চাদের অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার(ADHD) রোধ করতে পারে ইলিশ।

Ilish

ইলিশের সুনাম যেমন আছে, তেমন কিছুক্ষেত্রে বদনামও আছে। বাজারে আগুন দর বলে যাঁদের পাতে এখনও ওঠেনি, তাঁরা হয়তো একটু বাঁকা হাসি হাসবেন। আসলে দোষটা ইলিশের নয় তার মধ্য়ে থাকা হিস্টিডিন অ্যামাইনো অ্য়াসিডের।  যা থেকে হিস্টামিন তৈরি হয়ে মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়। যতরকম অ্যালার্জির মূলে এই হিস্টামিন। 

Ilish

কিন্তু কথা হল, হিস্টিডিন অ্যামাইনো অ্যাসিড কিন্তু মানুষের শরীরের জন্য ভাল। এর নানা রকম উপকারিতা আছে। তবে যদি টাটকা মাছ হয় তবেই। জল থেকে তোলার পরে দীর্ঘসময় মাছ সংরক্ষণ করে রাখলে, বেশি তাপমাত্রায় মাছ থাকলে এই হিস্টিডিন থেকে হিস্টামিন তৈরি হয়ে যায় এবং তা তাপমাত্রার ফারাকের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ডাঙায় তোলার পরে ১৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় মাছ থাকলেই ওই ব্যাকটিরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে সঠিক ভাবে সংরক্ষণ না করলে দীর্ঘদিনের বাসি মাছ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়। হিস্টামিনের প্রভাবে হাঁচি-কাশি, সারা শরীরে লাল দাগ, মাথাব্যথা, পেট ব্যথা, ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।

ইলিশ (Hilsa Fish) খান কিন্তু টাটকা মাছ কাওয়ার চেষ্টা করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দুপিস ইলিশ বা বেশি হলেও তিন পিস শরীর হজম করতে পারে। হিসেব অনুযায়ী ১৮০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হিস্টামিন শরীর নিতে পারে, এর বেশি হলেই সমস্যা শুরু হয়। তাই দিনে ছয় থেকে আট পিস মাছ গাদা-পেটি মিলিয়ে গোগ্রাসে না খেয়ে যদি নিজের পরিমাণ বুঝে খান তাহলে ইলিশে গ্যাস-অম্বল-অ্য়ালার্জি কিছুই হবে না। মনও ভরবে, রসনাও তৃপ্ত হবে।