ডায়েট কী? ছিপছিপে চেহারাই লক্ষ্য নয়, ভারতীয়দের অনেক ভুল ধারণা আছে

গুড হেলথ ডেস্ক

ওজন কমানোর জন্য লো ক্যালরি ডায়েট (Diet) মেনে চলতে হবে। এই মিথের পিছনে আমরা সকলেই ছুটি। কিন্তু লো ক্যালরি ডায়েট ঠিক কাকে বলে? ঠিক কতটা ক্যালরি আমাদের প্রয়োজন প্রতি দিন? তা হলে জেনে রাখুন এর কোনও নির্দিষ্ট হিসেব নেই। বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে দৈনন্দিন ক্যালরির পরিমাণ। রোজ আমরা কী খাচ্ছি, কতটা খাচ্ছি, সেই খাবার থেকে শরীরে কতটা পুষ্টি উপাদান যাচ্ছে আর কতটা খারাপ জিনিস ঢুকছে, তার সঠিক পরিমাণ বের করে সুষম খাবারের তালিকা তৈরি করার নামই ডায়েট। এই ডায়েট মানতে হলে কিন্তু খাই, খাই করা চলবে না।

‘খাই খাই করো কেন এস বসো আহারে/ খাওয়াব আজব খাওয়া ভোজ কয় যাহারে’… ডায়েট মানলে ‘ডাল ভাত তরকারি ফলমূল শস্য’ খেলে ঠিক আছে কিন্তু ‘চর্ব্য ও চোষ্য’ একেবারেই বাদ দিতে হবে। তবে ডায়েট নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে, সেগুলো আগে ভাঙা দরকার। ডায়েট (Diet) হল শরীর বুঝে, ওজন-উচ্চতা মেপে, খাওয়াদাওয়ার এমন একটা নিয়ম বেঁধে দেওয়া যাতে শরীর রোগভোগ থেকে দূরে থাকে। ‘খাই খাই’ করতে করতে আমরা ভুলেই যাই পাকস্থলীর একটা ধারণ ক্ষমতা আছে। লিভারেরও একটা হজম শক্তি আছে। সেইসব ছাপিয়ে গেলেই শরীরে হাজারটা রোগ বাসা বাঁধে। বদহজম, অম্বল-বুক জ্বালা, গ্যাস, ফ্যাটি লিভার, কিডনির রোগ, হার্টের রোগ, হাই কোলেস্টেরল ইত্যাদি তালিকাটা লম্বা। ডায়েট আমাদের সেই সীমাটাই বলে দেয়, কতটা খেতে হবে, কখন খেতে হবে এবং কী পরিমাণে খেতে হবে। তাই ডায়েট নিয়ে অযথা আতঙ্কে না ভুগে বরং মেনে চলার চেষ্টা করাই ভাল।

 balanced diet

ডায়েট জটিল অঙ্ক, ভয়াঙ্ক নয়

ডায়েট মানে হল ব্যালান্সড চার্ট (Diet)। মানে যার শরীরে যতটা সয়, তাকে ঠিক ততটাই খাবার দেওয়া। আর খাবার দিলেই হল না, তাতে পুষ্টি উপাদান কতটা আছে সেটাও যাচাই করা দরকার। ডায়েট সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়। যিনি অ্যাথলিট তাঁর ডায়েট যেমন হবে, যিনি সারাদিন অফিসে বসে কাজ করেন তাঁর ডায়েট (Diet) একেবারেই আলাদা হবে। বয়স, পেশা, রোজকার অভ্যাস, মেডিক্যাল হিস্ট্রি, পরিবারে রোগের ইতিহাস, ইত্যাদি দেখেশুনে যাচাই করে ক্য়ালোরির হিসেব কষে ডায়েট চার্ট বানিয়ে দেন পুষ্টিবিদেরা। এইচার্ট বানানো কিন্তু সহজ কাজ নয়, সবটাই জটিল অঙ্ক। যিনি অ্য়ানিমিয়ায় ভুগছেন তাঁর ডায়েট চার্ট একরকম হবে আবার যাঁর হাই কোলেস্টেরল-ওবেসিটি তাঁর ডায়েট অন্যরকম হবে। কারও চার্টে শুধু প্রোটিন বেশি থাকবে, কেউ আবার কার্বোহাইড্রেট ছুঁতেই পারবেন না। কিন্তু এরপরেও শরীরে ভিটামিন, মিনারেলস, ফাইবার সবকিছুর পরিমাণ সমান সমান থাকবে, এনার্জি ফ্লো-ও ঠিক রাখতে হবে। তাই সবটাই অঙ্কের খেলা।

বিশ্রামে থাকাকালীন আপনার শরীর যে পরিমাণ এনার্জি বার্ন করতে পারে। প্রতি দিন আমাদের শরীর ৬০-৭৫% এনার্জি বিশ্রামে থাকাকালীন বার্ন করে। বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বজায় রাখার জন্য যে পরিমাণ ক্যালরি বার্ন হয় তা বিএমআর-এর হিসেব দেয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হিসেব হল ওজন (কেজি) x ২২, পুরুষদের ক্ষেত্রে আবার ওজন (কেজি) x ২৪।

healthy eating

সারা দিন যে পরিমাণ এনার্জি প্রয়োজন হয়, তা পুরণের জন্য যে পরিমাণ ক্যালরি আমাদের খাওয়া প্রয়োজন তাকে বলা হয় টোটাল এনার্জি রিকোয়্যারমেন্ট। বেসাল মেটাবলিক রেট ও ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি লেভেল গুণ করে পাওয়া যায় টিইআর বা টোটাল এনার্জি রিকোয়্যারমেন্ট। যদি আপনি ওজন বাড়াতে চান, কমাতে চান বা বর্তমান ওজনই ধরে রাখতে চান, তাহলে এনার্জি ব্যালান্স সেট করতে হবে। সেই মতো টিইআর সেট করবেন পুষ্টিবিদেরা। ওজন বাড়াতে চাইলে এনার্জি যতটা শরীরে ঢুকবে তা যেন আউটপুটের চেয়ে বেশি হয়, ওজন কমাতে চাইলে এনার্জি আউটপুট ইনটেকের চেয়ে বশি হতে হবে। ওজন একই রাখতে চাইলে দুটোই সমান সমান হতে হবে। এই হিসেব কষেই খাবারের তালিকা ও ব্যায়াম বলে দেবেন ডায়েটিশিয়ানরা।

 

ব্যালান্সড ডায়েট মানলেই কাজ হয় ম্যাজিকের মতো

বাড়িতে বানানো রোজকার একঘেয়ে রুটি-তরকারি আর মাছ-ভাত মুখে রোচে না। অফিসে কাজের কাজের ফাঁকে সময় পেলেই অর্ডার করছেন সুইগি অথবা জোম্যাটোয়। তা ছাড়া কলকাতার নামিদামী রেস্তরাঁগুলি প্রায়শই হয়ে ওঠে আপনার ডিনারের ঠেক। শহরজুড়ে ফাস্ট ফুডের হাতছানি। ফোনের একটা ক্লিকেই চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় চলে আসবে হাতের মুঠোয়। ওজন বাড়হে হুড়মুড়িয়ে। তখনই ডায়েটের দিকে ঝুঁকবে মন। সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে, নেটে ঘোরাঘুরি করে নিজের মনের মতো ডায়েট বের করে তা মানতে গিয়ে মুশকিলে পড়েন অনেকে। শরীরে পুষ্টি উপাদানের দফারফা হয়ে অপুষ্টির শিকার হতে হয়।

এখন ডায়েটও নানা রকম—কিটো ডায়েট, ব্লাড টাইপ ডায়েট, র ফুড ডায়েট, মেডিটেরিয়ান ডায়েট, প্রোটিন ডায়েট, সাউথ বিচ ডায়েট, ক্র্যাশ ডায়েট, ক্যালোরি অ্যান্ড ওয়েট কন্ট্রোল ডায়েট, ডিউকান ডায়েট, লো-কার্ব ডায়েট, এইচসিজি ডায়েট ইত্যাদি। প্রতিটা ডায়েটেরই নিয়ম আছে, সেটা বিএমআই (বডি-মাস ইনডেক্স) দেখে ঠিক করে দেন ডায়েটিশিয়ানরা। শরীর বুঝে সেইসব ডায়েট করতে হয়। ঠিক মতো ক্যালোরি মেপে খেতেও হয়, না হলেই শরীরে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হবে। তাই যে কোনও ডায়েটই করুন না কেন তা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে করাই ভাল। নিজে বাহাদুরি করে ইচ্ছামতো ডায়েট করতে গেলেই মুশকিল। হিতে বিপরীত হবে।

Healthy Indian Dishes

ব্যালান্সড ডায়েট রোজকার যাপনে মেনে চলাই যায়। এতে আলাদা করে বিশাল খরচের ব্যাপার নেই, ঘরে যা রোজকার খাওয়াদাওয়া তারই একটু এদিক ওদিক করে ডায়েট (Diet) মানা যায়। কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল সব থাকবে ব্যালান্সড ডায়েটে। শাকসবজি, বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি, স্যালাড যেন রোজের খাদ্যতালিকায় থাকে। ডাল, রুটি ফাইবারের জোগান অটুট রাখবে। গোটা ফলেও প্রচুর ফাইবার থাকে। আবার ঘি, সর্ষের তেল, তিলের তেল, আখরোট, কাজু, আমন্ড ফ্যাটের চাহিদা পূরণ করবে, তবে বাইরে থেকে কেনা খাবার, ট্রান্স ফ্যাট আছে এমন খাবার খাওয়া চলবে না। রোজের খাবার থেকেই কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট ছেঁকে নিতে হবে। প্রোটিনের জন্য ডাল, পনির, ছানা, ডিম, চিকেন, ছোলা-মুগ, ছাতু, মাছ সবই খেতে পারেন। প্রতিদিন খাবার পাতে ৪০ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট রাখতে হবে। তবে হ্যাঁ, সাদা ভাতের চেয়ে যেহেতু লাল চালের ভাত, ওটস বা জোয়ার-বাজরা জটিল কার্বোহাইড্রেট তাই এগুলিকে প্রসেস করতে শরীরেরও বেশি সময় লাগবে। রাতের দিকে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণটা কমিয়ে দিন। অল্প করে সাদা ভাত শরীরে ক্ষতি করে না। তবে ডায়াবেটিস বা অন্য রোগ থাকলে ব্রাউন রাইসও খেতে পারেন। সুষম ডায়েট বা ব্যালান্সড ডায়েটে শরীর-রসনাকে বঞ্চিত করে কিছু করা হয় না। সবই খান কিন্তু মেপে আর সময় বুঝে।

রোগহীন সুস্থ শরীর ধরে রাখার নামই ডায়েট

আমরা ছোট থেকে যে পরিবেশে যা খেয়ে বড় হয়ে উঠেছি, আমাদের শরীরও সেভাবেই তৈরি হয়েছে। শরীরের গড়ন ও চাহিদাও সেই অনুযায়ী। কেউ যদি ছোট থেকে দু’বেলা ভাত খেয়ে বড় হন আর হঠাৎ ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেন, তার বদলে শুধু সবজি ও মাংস সেদ্ধ খেতে থাকেন, তা হলে কিন্তু শরীর মেনে নেবে না। নানা রকম অসুখবিসুখ দেখা দেবে। কিছুদিন পরেই ডায়েট ভুলে বেশি করে জাঙ্ক ফুড খেয়ে ফেলবেন। তাই যা-ই খাবেন, পরিমিত ভাবেই খেতে হবে। সময়মতো খেতে হবে। ডায়েটের (Diet) আসল উদ্দেশ্য এটাই। মেদহীন, ছিপছিপে চেহারায় স্টাইল স্টেটমেন্ট মেনে চলার কথা বলে না ডায়েট, বরং রোগহীন সুস্থ শরীর ধরে রাখার নামই ডায়েট।

Balanced Diet

এখন আবার কিটো ডায়েটের চাহিদা বেড়েছে। তবে এই ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। শর্করার অভাবের কারণে মূলত ফ্যাট বার্ন করেই শরীরের এনার্জির ঘাটতি মিটবে। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিলে শরীর যে বিশেষ মেটাবলিক পর্যায়ে চলে যায় তাকেই ডাক্তারি ভাষায় ‘কিটোসিস’ বলে। আর সেই থেকেই এই ডায়েটের নাম হয় ‘কিটো ডায়েট’। কিটোজেনিক ডায়েটের ক্ষেত্রে ৫% কার্বোহাইড্রেট, ২৫% প্রোটিন এবং ৭০% ফ্যাট জাতীয় খাবার রাখতে হবে আপনার ডায়েটে। তবে এই ধরনের ডায়েট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে করাই ভাল।

চোখের খিদে রাখবেন না

ডায়েটের এটাই হল মূল মন্ত্র। খিদে পেলে তবেই খান। সারাদিনে ৬টা ছোট ছোট মিল খান, তাহলে খাই খাই বাতিক কমবে। ভুলভাল খাওয়ার ইচ্ছে জাগলেই বেশি করে জল খান। নিজেকে সতর্ক করুন আর কেন এরকম ইচ্ছে হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করুন। ক্লান্তি থেকেই তো মূলত এই সব খাবার ইচ্ছে জাগে, তাই সেটা কাটাতে পর্যাপ্ত ঘুমোন। কী কী খাচ্ছেন ডায়েরিতে লিখে রাখুন। পর্যাপ্ত হাঁটাচলা করুন। মনকে শান্ত রাখুন।

ভুল ডায়েট (Diet) করবেন না

ডায়েট করুন কিন্তু ভুল ডায়েট করবেন না। অনেকে ইন্টারনেট দেখে বা বন্ধুবান্ধব ভাল ফল পেয়েছে দেখে সেই ডায়েটই হয়তো ফলো করতে শুরু করে দেন। ডায়েটিশিয়ানের কাছে গেলেও ডায়েট চার্ট ক’দিন ফলো করার পরে মাঝপথেই তা ব্রেক করে ফেলেন। বিভিন্ন রকম ডায়েট ফলো করার চেষ্টা করেন। এমন করলে ওজন তো নিয়ন্ত্রণে থাকবেই না, নানানটা রোগ দেখা দেবে। গর্ভাবস্থায় ও হার্টের রোগ থাকলে ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিয়েই ডায়েট করা ভাল।

ডায়েটে যেমন কী খাবেন তা গুরুত্বপূর্ণ, কতক্ষণ অন্তর খাবেন, তা মেনে চলাও সমান জরুরি। কিটো, ইন্টারমিটেন্ট এই ধরনের ডায়েট এক মাস বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করতে দেওয়া হয়। অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিজের ইচ্ছেমতো এই ধরনের ডায়েট মানা যায় না। মনে রাখতে হবে, সুষম আহারই ঠিক ডায়েট। শরীরে যেমন প্রোটিনের দরকার আছে, তেমনই ফ্যাট, কার্বস, ভিটামিনস, মিনারেলস এ সবেরও দরকার আছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ভুলভাবে  ডায়েট মানলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া, হাইপোটেনশন হতে পারে।