নিকোটিনের ধাক্কায় বেহাল হৃদয়, হাঁসফাস করছে শরীরজুড়ে ধমনীও

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

জীবনের ইঁদুরদৌড়ে যাপনের স্ট্রেস বাড়ছে বই কমছে না। স্ট্রেস যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে সময়! শরীরের প্রতি অবহেলার সুযোগে অকালে বাসা বাঁধছে নানা অসুখ। দ্রুত বয়স বাড়ছে হার্টেরও। সমস্যার হাত থেকে হার্টকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যা যা করণীয়, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, রুটিনবদ্ধ লাইফস্টাইল– এসব থেকে অনেকটাই দূরে থাকেন অনেকে। উল্টে, হার্টকে ভাল রাখার বদলে, তার জন্য বিপদ ডেকে আনেন সিগারেটের ধোঁয়ায়। এই নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করলেন কলকাতার অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর বিকাশ মজুমদার।

নিকোটিন মাত্রেই খারাপ, তা সে যেকোনও ফর্মে থাক

স্মোকিং এমন একটা সমস্যা, এই প্রজন্মের বহু মানুষ যার শিকার। অথচ এই ধূমপান কিন্তু হার্টের অসুখের একটা মস্ত বড় কারণ। শুধু হার্টের অসুখ নয়, ধূমপান সমস্ত সিস্টেমকেই আক্রমণ করে। ফুসফুসকে নষ্ট করে, আমাদের কার্ডিও ভাস্কুলার সিস্টেমকে বিপদে ফেলে। আর্টারি পুরু করে, রক্তচাপ বাড়ায়, স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায়, বাড়ায় হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা।

Smoking Can Cause Heart Disease and Strokes, World Health Organization Video Warns

নিকোটিন মাত্রেই খারাপ। অনেকে বলেন, সিগারেট খান না কিন্তু খৈনি খান। এটা কিন্তু কোনও কাজের কথা নয়। তামাক যে কোনও ফর্মে গ্রহণ করাটাই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এই বার্তাটা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ধমনীর ভিতরে মসৃণ স্তরটিকে নষ্ট করে নিকোটিন

নিকোটিন যখন শরীরে ঢোকে, তখন আর্টারির ভিতরে যে এন্ডোথেলিয়াম থাকে, সেটি ড্যামেজ করে। এন্ডোথেলিয়াম হল শরীরে আর্টারিগুলির ভিতরের গায়ে থাকা একটি পাতলা স্তর, যার কারণে রক্তচলাচল মসৃণ হয়। এখন নিকোটিন সেই স্তরটিকে নষ্ট করে ফেলে, যে কারণে রক্ত চলাচল বাধা পায়। প্ল্যাক জমতে থাকে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা থাকে। এন্ডোথেলিয়াম বেশি রাফ হয়ে গেলে ব্লকেজ হওয়ারও ঝুঁকি বাড়ে।

Electronic cigarettes as dangerous to heart as tobacco. Quit smoking - YouTube

শুধু হার্টের  নয়, পায়ের বড় আর্টারিগুলিতেও এই ব্লকেজ হতে পারে নিকোটিনের কারণে। অনেক সময়ে মানুষ হাঁটছে চলছে, হঠাৎ পায়ে একটা ক্র্যাম্প হল অকারণে। অসাড় হয়ে গেল পা। যার কারণ, রক্তচলাচল বাধা পেয়েছে।

এন্ডোথেলিয়ামের কাজই হচ্ছে রক্তচলাচলকে সহজ ও গতিশীল করা। নিকোটিন প্রয়োগ করা মানেই সে কাজে বাধা তৈরি। এছাড়াও ধমনীগুলির পেশি অনেক দ্রুত ও বেশি স্টিফ হয়ে যায় ধূমপানের ফলে। বয়সকালে যে স্টিফনেস আসার কথা, তা আরও আগেই আসে। যা আবারও সেই রক্তচলাচলকে বাধা দেয়।

হরমোনাল রাশে ঝটকা হার্টে

শুধু তাই নয়, ধূমপান রক্তচাপও বাড়িয়ে দেয় শরীরের। কারণ অনেক সময় নিকোটিনের কারণে শরীরে হরমোনাল রাশ হয়। অ্যাড্রিনালিন বাড়তে পারে, বা অন্য হরমোন। ফলে ঝট করে আর্টারির সঙ্কোচন হতে পারে। সেটাও রক্তচলাচলের গতিকে ধাক্কা দেয়। বাড়িয়ে দেয় রক্তচাপ।

নিকোটিন শরীরে ঢুকলে অনেক ফ্রি র‌্যাডিক্যাল জেনারেট করে, যা শরীরের বিভিন্ন কোষেরও ক্ষতি করে। আসলে শরীরের যেখানেই রক্তবাহ ধমনী রয়েছে, সেখানেই অ্যাটাক করে নিকোটিন। নানা রকম পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ-কে ডেকে আনে ধূমপান।

Over 20% of Mumbai youth start smoking by 20 to look cool - Living News , Firstpost

ধূমপানে কোনওরকম গৌরব নেই

স্মোকিংকে গ্লোরিফাই না করে, তাকে নিন্দা করা উচিত প্রথম থেকেই। সিগারেট খাওয়ার মধ্যে কোনও নায়কোচিত ব্যাপার নেই। তবে এটা বলা যত সহজ, যিনি ইতিমধ্যেই নিকোটিনের নেশায় আক্রান্ত, তাঁর পক্ষে সেটা ছেড়ে দেওয়া খুবই কঠিন। অনেকটাই মনের জোর লাগে। যাঁর এতটা জোর নেই, তিনি মনোবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। আজকাল কিছু চুইংগাম পাওয়া যায়, স্মোকিংয়ের ক্রেভিং দূর করার জন্য। অনেকে আবার ই-স্মোকিং করেন, সেটার পরামর্শ দিচ্ছেন না চিকিৎসক। কারণ সেটার ক্ষতি একটু কম হলেও একেবারে শূন্য নয়।

শুধু নিজে স্মোক করা যে নিজের জন্য খারাপ, তাই নয়। আশপাশের মানুষগুলোর জন্যও খারাপ, তাঁরা বিনাদোষে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের শিকার হচ্ছেন। পরিবারের মানুষের কথা তো বাদই দেওয়া যায়, তৃতীয় কোনও ব্যক্তির জন্যই তা মেনে নেওয়া যায় না।

Secondhand smoke | Irish Cancer Society

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যিনি বহু বছর ধরে সিগারেট খাচ্ছেন, তিনি যে মুহূর্তে স্মোকিং বন্ধ করবেন, সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর শরীর সুফল পেতে শুরু করে। এমন নয়, যে কয়েক মাস বন্ধ থাকার পরে তবে শরীর সাড়া দেবে।