Delirium: সবসময় ভুল বকা, যুক্তিহীন তর্ক, মাথায় কিলবিল করে অদ্ভুত চিন্তা, এই রোগে ভুগছেন অনেকে

গুড হেলথ ডেস্ক

বয়সকালে ভিমরতি বলে একটা কথাই আছে। ভিমরতি কিনা জানা নেই, তবে নিরন্তর ভুল বকে যাওয়া, অকারণে তর্ক, যুক্তি নেই এমন কথাবার্তা বলা, ভুলভাল মন্তব্য করা–এইসব একটা রোগের পর্যায়তেই পড়ে (Delirium)।

তাই বলে সব্বাই অসুস্থ এমনটা নয়। কেউ যদি সবসময়ই অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে, একই কথা নানাভাবে আওড়ে যেতে থাকে, একই বিষয়ে নিয়ে অযৌক্তিক আলোচনা করতেই থাকে বা নিরন্তর আজেবাজে বকবক করতে থাকে, তাহলে ভয়ের কারণ আছে বইকি! ধরুন কথা হচ্ছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের, টেনে আনবেন রানি ভিক্টোরিয়ার কথা। সেই নিয়ে বিরক্তিকর ও একঘেয়ে আলোচনা করেই যাবেন।

বয়স্করাই যে এই রোগে ভুগছেন তা নয়, অনেক কমবয়সিও এমন ভুল-বকা রোগে আক্রান্ত। তাদের আবার এমন আচরণের জন্য জেদি বা রগচটা মনে হতে পারে।

বকবক করাটা যে খারাপ তা নয়। তবে যদি কেউ একনাগাড়ে ভুলভাল বকে যেতে থাকে যার কোনও মাথামুণ্ডুই নেই, আর বকবকের সঙ্গে উত্তেজনায় টগবগ করে নানারকম অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে– সেটাকে তখন ঠিক পাগলামো বলা যায় না, তবে ডাক্তারি ভাষায় এর একটা গালভরা নাম আছে–‘ডেলিরিয়াম’ (Delirium)। ডেলিরিয়াম মানেই হল অযৌক্তিক কথাবার্তা বলা। নিজের ধারণাকেই ঠিক বলে মনে করা। নানারকম অসুখবিসুখ, মাথায় চোট বা মেন্টাল ট্রমা থেকে এমন রোগ হতে পারে।

Feeling Delirious

যুক্তি ছাড়াই তর্ক, হঠাৎ করে বদলে যায় মুড, কখনও রাগী-কখনও নরম

এইসব মানুষরা মনের বিচিত্র অবস্থায় ভোগেন। কখনও রেগে আগুন তেলে বেগুন, আবার কখনও মাথা বরফের মতো ঠান্ডা। কখনও তেড়েমেরে ডান্ডা, করে দেব ঠান্ডা ভাব, আবার কখনও শান্তশিষ্ট ভাল মানুষটি। Delirium Symptomsমন ও মেজাজ ঋতুবদলের মতোই বদলে যেতে থাকে। মুডের কোনও ঠিকঠিকানাই নেই। এই দেখলেন ভাল কথা বলছে, আবার পরক্ষণেই দেখবেন একই বিষয় নিয়ে একটানা অযৌক্তিক কথা বলেই যাচ্ছে। নিজের ধারণাকে সঠিক বলে চালানোর মরিয়া প্রয়াস করছে। মুড সুয়িং এই রোগের বৈশিষ্ট্য।

এরা সবসময়েই বিভ্রান্ত। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় যে কোনও কাজে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। ভুল বকার সঙ্গে ভুলো রোগও হয় অনেকে। সবসময়ই কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাব। ঠিকমতো বুঝতেও সমস্যা হয়। নিজের ভাবপ্রকাশেও স্বচ্ছ হন না ডেলিরিয়ামের রোগীরা।

ভুল-বকা রোগ: মাথায় গিজগিজ করে আজেবাজে চিন্তা

অসংলগ্ন কথাবার্তাই এই রোগের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে। মাথায় চিন্তা-দুশ্চিন্তারা ঘোরাফেরা করে। চেতনে-অবচেতনে উঁকিঝুঁকি দেয়। তারই প্রতিফলন দেখা যায় কাজে, কথাবার্তায়, ব্যবহারে। এদের আচরণে আচমকাই বদল আসে। কখনও মেঘ আবার কখনও বৃষ্টির মতো মেজাজ বদলে যেতে থাকে। অভিব্যক্তিতেও বদল আসতে পারে অনেকের। কী করছেন, কী বলছেন, অন্যের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছেন, তা ঠিকমতো ঠাওর করতে পারেন না এই রোগীরা। রোগ আবার বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে ডিমেনশিয়া, নার্ভের জটিল অসুখ অবধি হতে পারে।

delirium

স্ট্রেস-অ্যালকোহল-দুর্ঘটনা-শক ডেলিরিয়াম একটা ধাঁধা

ডেলিরিয়াম নিয়ে বশি চর্চা হয় না। এই রোগ সম্পর্কেও অনেকে ওয়াকিবহাল নন, নামই শোনেননি অনেকে। অজান্তেই চুপিসাড়ে মন কুরেকুরে খায় ডেলিরিয়াম। এর কারণ অনেক কিছুই হতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধরুন কারও নিউমোনিয়া হয়েছিল, তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা রোগী ভবিষ্যতে এই রোগের শিকার হতে পারেন।

ব্লাড প্রেসারের রোগী ভুলভুল ডোজে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খাচ্ছেন, তাঁর ব্রেনে কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স হয়ে এমন রোগ হতে পারে।

আবার ধরুন, সিভিয়ার অ্যাজমা বা হাঁপানির রোগী যাঁরা ব্রেনে অক্সিজেন কম পৌঁছচ্ছে, তিনিও এমন ভুল-বকা রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি নানারকম অসুখবিসুখে ভুগছেন, শরীরে গুচ্ছ কোমর্বিডিটি, তাহলেও ডেলিরিয়াম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

কারণ আরও আছে— ব্রেন স্ট্রোক থেকে ফিরে আসা রোগী, মাথায় অস্ত্রোপচার হয়েছে এমন রোগী, আচমকা কোনও দুঃসংবাদ পেয়ে মেন্টাল শকে ভুগছেন এমন কেউ ডেলিরিয়ামে আক্রান্ত হতেই পারেন।

 Brain

প্রচণ্ড মানসিক চাপ, অবসাদ, একাকীত্ব থেকেও এমন রোগ হতে পারে। নিজের ভাবনা ও যুক্তি প্রকাশ করার সুযোগ কম পান, এমন কেউ ডেলিরিয়ামে ভুগতে পারেন।

কম ঘুম, ডিহাইড্রেশন, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকেও এই রোগ হতে দেখা গেছে, কেন তার যুক্তি মেলেনি।

রোগ পরীক্ষা না হলে কাওকে রোগী ভেবে বসবেন না— রোগ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে বা রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলে ডাক্তার দেখিয়ে, কিছু টেস্ট করাতে হবে। বুকের এক্স রে, ইলেকট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম, সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, মূত্রের কিছু পরীক্ষা করলে তবেই রোগ ধরা পড়ে। এরপর থেকে কেউ বেশি বকবক করলে আবার তাকে রোগী ভেবে বসবেন না!