বাইপোলার ডিসঅর্ডার: মন চলে দুই বিপরীত পথে, নিজেকে শেষ করে দিতেও ইচ্ছে করে

কখনও ঠা ঠা রোদ, তো কখনও মেঘলা আকাশ। ফুরফুরে মেজাজের মানুষও হঠাৎ করে বিষণ্ণ হয়ে পড়তে পারে। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই হাসি-তামাশায় মেতে ছিল, হঠাৎ করেই প্রচণ্ড রুক্ষ মেজাজের এক অবসাদগ্রস্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমার মধ্যেই আর এক আমি।

নিজের সত্তার মধ্যেও লুকনো আছে আরও এক সত্তা। দুইয়ের প্রকৃতি ভিন্ন। আবার কখনও তারা মিলেমিশে যায়। একের মধ্যেই অন্যকে পালন করার এই প্রবৃত্তি মনের এক জটিল অবস্থা। কখনও হাশিখুশি, উচ্ছ্বাস আবার কখনও মন যেন ভেঙেচুড়ে, দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সবকিছু তছনছ করে ফেলতে ইচ্ছে করে। ভেতর থেকে দলাপাকানো একটা কান্না ঠেলে উপরে উঠতে চায়। মনের এই দুই বিপরীতধর্মী আচরণকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার’ (Bipolar Disorder) । বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত এই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগছিলেন বলেই দাবি করেছেন তাঁর থেরাপিস্ট ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট সুজান ওয়াকার।

কখনও ঠা ঠা রোদ, তো কখনও মেঘলা আকাশ। ফুরফুরে মেজাজের মানুষও হঠাৎ করে বিষণ্ণ হয়ে পড়তে পারে। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই হাসি-তামাশায় মেতে ছিল, হঠাৎ করেই প্রচণ্ড রুক্ষ মেজাজের এক অবসাদগ্রস্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মনের এই বিচিত্র ভাবগতিকই বাইপোলার ডিসঅর্ডারের লক্ষণ। মন ও মেজাজ সবসময় দুই চরম স্থিতিতে থাকে। হয় প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস না হলে একেবারে ভগ্ন, বিষাদগ্রস্ত, অবসাদে আচ্ছন্ন। মনের এই অসুখ যে কতটা মারাত্মক হতে পারে সেটা টের পান কাছে থাকা মানুষজনই।

কখনও আনন্দ, কখনও রাগ, নিজেকে শেষ করে দিতেও ইচ্ছে করে

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের রোগীর মানসিক স্থিতি ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে তার আঁচ পাওয়া মুশকিল। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেকের ক্ষেত্রে মনের এই রোগ প্রচণ্ড আনন্দ বয়ে আনে। সৃজনশীল মানুষদের ক্ষেত্রে এমনটা হতে দেখা গেছে। অন্তর্মুখী, কম কথা বলা মানুষও মেলামেশা করছেন, বেশি কথা বলছেন, সৃজনশীন কাজ করছেন এমন উদাহরণও আছে।

এটা গেল একটা দিক। অন্যদিকটা হচ্ছে মারাত্মক। সেখানে মেজাজ শূন্য থেকে একশোর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। কখনও ভাল তো কখনও একদম খারাপ। রোগীর মনে হতে থাকে সে অন্য একটা মানুষ। সম্পূর্ণ অন্য চরিত্র নিয়ে বাঁচছে। সেই মতো কাজ করতে শুরু করে। আচরণে বদল আসে। হাবভাব পাল্টে যায়। এমনও দেখা গেছে কথা বলার ধরণ, মতিগতি সবই বদলে গেছে রোগীর। যেন অন্য মানুষ হয়ে উঠেছে। একেই বলে দ্বৈত সত্তা।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের আরও একটা খারাপ দিক হল রোগী তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করে। মনের ভেতর উদ্বেগ, দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। রাগ, দুঃখ, ঘৃণা একসঙ্গে জেগে ওঠে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রতিশোধ-স্পৃহাও প্রবল হয়। আত্মহত্যার মানসিকতা জেগে ওঠে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভোগা অনেক রোগীই মনে করেন তাঁর জীবনের সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি মুখ থুবড়ে পড়েছেন। সবকিছু ভেঙেচুরে বেরিয়ে আসতে চান অনেকে, আবার অনেকে জীবনকেই শেষ করে দিতে চান।

মন এক বিচিত্র রসায়ন

মানসিক স্থিতি টালমাটাল হতে পারে যে কোনও বয়সেই। বয়ঃসন্ধিতেও প্রবল মানসিক চাপ থেকে বাইপোলার ডিসঅর্ডার হানা দিতে পারে। বিজ্ঞান বলে, শরীরের ভেতর যেমন রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া চলতে থাকে, মনেও ঠিক তাই। মস্তিষ্কের সেরাটোনিন ও ডোপামিন হরমোনের বেশি ক্ষরণ হলে মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর এই অবস্থারই চরম পরিস্থিতি হল বাইপোলার ডিসঅর্ডার। এই অসুখ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে আবার বছরের পর বছর ধরেও চলতে পারে। ডাক্তাররা বলেন, এমনও দেখা গেছে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভোগা রোগী সুস্থ হয়েও পরে বিপরীতধর্মী আচরণ করতে শুরু করেছেন। সাইক্লোথাইমিক ডিসঅর্ডারও দেখা গেছে।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সঙ্গেই আসতে পারে হাইপোম্যানিয়া, লক্ষণ অনেক

হাইপোম্যানিয়া হলে তার অনেক লক্ষণ দেখা যায়। শুরুটা হয় সেই মানসিক চাপ, উদ্বেগ দিয়ে। ধীরে ধীরে এই মানসিক অবসাদই একটা বিকারে দাঁড়িয়ে যায়। মানুষের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। নিজেকে ব্যর্থ বলে ভাবতে শুরু করে রোগী, মনে হয় জীবনে সবকিছু হারিয়ে গেল, বেঁচে থাকাই অর্থহীন। এই ভাবনা থেকেই উৎকণ্ঠা, কম ঘুম এবং শেষে যে কোনও ভয়ানক পরিস্থিতিও ঘটাতে পারে রোগী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মনের এই জটিল অবস্থায় রোগী পুরনো দিনের স্মৃতি আঁকড়ে ধরতে চায়। পুরনো দিনে ফিরে যেতে চায়।

অনেকে আবার বেশি কথা বলা শুরু করে, নিজেকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ইনসমনিয়া এই রোগের একটা বড় লক্ষণ। চরম বিষাদ, নিজেকে অপরাধী ভাবার মানসিকতাও প্রবল হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময় রোগীর মানসিক অবস্থা এতটাই স্পর্শকাতর থাকে যে সামান্য চাপ বা উদ্বেগও ক্ষতি করতে পারে। তাই খুব নরম ব্যবহার করতে হয় রোগীর সঙ্গে, আগলে রাখতে হয় সবসময়। রোগী এই সময় এককীত্বে ভুগতে থাকে। তাই বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং করতে হয়। বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা হাইপোম্যানিয়ায় ভোগা রোগীদের মনের জোর বাড়ানোটা সবচেয়ে আগে জরুরি। রোগী যে নিঃসঙ্গ নয় সেটা বোঝানোর দরকার হয়। তার পরেই সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং শুরু করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।